ইরান যেমন দেখলাম: রুশিয়া জামান রত্নার বই রিভিউ

ব্রি. জে. ড সাখাওয়াত হোসেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার brig gen dr m sakhawat hossain bangla chronicle book review বই রিভিউ বই আলোচনা

ইরানের সাথে ভারতবর্ষের সম্পর্ক আজ কালের নয়।  বলা হয়ে থাকে খ্রীস্টপূর্ব ৫০০০ বছর পূর্বে আরিয়ান বা আর্যরা সিন্ধু নদের তীরে বসতি স্থাপন করে।  সম্ভবত খ্রীস্টপূর্ব ২৫০০ বছর পূর্বে তারা গঙ্গা বেসিন বা বর্তমান বাংলার মাটিতে পা রাখে।  স্থানীয় অসভ্য আদিবাসীদের বিতারিত করে এবং তাদের মুষ্টিমেয়দের দাস করে আর্যরা তাদের বিজয় নিশান উড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের তীরে এই পলিমাটির ভূমিতে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।  সেই থেকে বঙ্গভূমির সন্তানদের রক্তে আর্য রক্ত মিশে একাকার হয়ে গেল।  উন্নত সভ্যতার অধিকারী আর্যরা এ ভূমিকে নিজের করে নিল।  তাই বলে মাতৃভূমি তৎকালীন পারস্যের সাথে সম্পর্ক ইতি কিন্তু টানলো না।  বরং রাজনৈতিক,  অর্থনৈতিক,  বাণিজ্যিক,  কূটনৈতিক এবং সেই সাথে সাংস্কৃতিক সুসম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ পেল। বিভিন্ন সময় শত শত আর্য বঙ্গদেশ তথা ভারতবর্ষ শাসন করেছে। তাই পারস্য বা ইরান নিয়ে আগ্রহ ভারত উপমহাদেশে বরাবরই রয়েছে।  উপমহাদেশের জনগণের ভাষা,  সংস্কৃতি,  ধর্ম এবং কৃষ্টিতে পারস্যের প্রভাব স্পষ্ট। সেই জানার আগ্রহ থেকেই মূলত “ইরান যেমন দেখলাম” বইটি সংগ্রহ করা।

 

 

হাজার হাজার বছেরর পারস্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি,  জীবনযাত্রা,  খাদ্য কিংবা সম্রাজ্যের ইতিহাস এবং রোমাঞ্চকর যুদ্ধের কাহিনী বর্ণনা করা ছোট পরিসরে কখনই সম্ভব নয়। লেখক শুরুতেই তাই নিজের অপারগতা প্রকাশ করে লিখেছেন, ” প্রায় ২৫০০ বছরের সভ্যতার বিবরণ ভ্রমণ কাহিনীতে দেয়া সম্ভব  নয় তথাপি আমার মত চেষ্টা  করেছি ”

 

 

ভ্রমণ নিয়ে লেখক এবং তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে এক প্রকার সূক্ষ্ণ দ্বিধা থাকলেও দারিউস দ্য গ্রেট,  সাইরাস, হাফিজ, রুমি, সাদী আর প্রতাপশালী শাসক শাহ রেজা শাহ (যাকে লেখক কাছ থেকে দেখেছেন এবং কথা বলেছেন) -এর দেশ ইরান দেখার লোভ সংবরণ করতে পারেননি।  তাঁর দেশ ভ্রমণের নেশা মজ্জাগত। নিজে ভ্রমণ করে তার স্বাদ পাঠকদের প্রদানে কার্পণ্য মোটেও করেননি। বরং বারবার তাঁর ভ্রমণ কাহিনীগুলোতে ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক রোমাঞ্চকর ঘটনা, রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ বরাবরই পাঠকের জ্ঞান তৃষ্ণা মেটাতে যথেষ্ট জলের যোগান দিয়েছে। লেখকের ভ্রমণকাহিনীগুলো অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনী থেকে যে আলাদা সে কথা বলার প্রয়োজন বোধ হয় নেই। “সাহিত্য যে নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং তা থেকে জ্ঞান চর্চাও করা যায় সেদিকে লেখকের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে৷”

 

২৯২ পৃষ্ঠায় ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে, “ইরান যেমন দেখলাম” নামক ভ্রমণ কাহিনীটি।  শেষের কয়েক পাতা জুড়ে লেখক, তাঁর সফর সঙ্গী এবং ইরানের ঐতিহাসিক স্থানের ছবি রয়েছে- যেগুলো পাঠকের চোখ জুড়িয়ে দেবে। গদ্য-পদ্য মিশ্রিত এক অসাধারণ ভ্রমণকাহিনীকে চম্পুকাব্য বলতেও দ্বিধা নেই। বরং পড়ার সময় মনে হয়েছে এটি চম্পুকাব্যের আধুনিক সংস্করণ।

 

লেখক পেশাগত জীবনে কাজ করেছেন উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা এবং পরে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। অবসর জীবনে তিনি লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সুখ্যাত। খুব সচেতনভাবে নিজের পরিচয়  ছাপিয়ে একজন পেশাদার লেখক হবার আপ্রাণ চেষ্টা তাঁর প্রতিটি ভ্রমণকাহিনীতে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সাহিত্য কখনই বাস্তবতা বহির্ভূত হতে পারে না।  “কল্পনার সাথে বাস্তবতা অথবা বাস্তবতার সাথে কল্পনা মিশ্রিত না হলে সাহিত্য পরিপূর্ণ হয় না। “তাই তাঁর স্বভাবসুলভ লেখনীতে রাজনৈতিক ইতিহাস চর্চা ঠাঁই পাবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পারস্যের হাজার হাজর বছরের যে রোমাঞ্চকর ও নাটকীয় ইতিহাস রয়েছে তা এই ছোট পরিসরে বর্ণনা করা মোটেও সম্ভব নয়।  তবুও লেখক তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব দিয়েই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, ঐতিহাসিক স্থানের বর্ণনা, রাজনীতি,  অর্থনীতি, শিল্প সাহিত্য, ধর্মীয় বিশ্বাস,  খাবার, কালচার এবং জনগনের মন মানসিকতা ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং মোটা দাগে বলতে গেলে এ ক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন৷

 

লোক মুখে শোনা যায় “প্রেমের কবি হাফিজ শিরাজীর মাজারে কেউ উপস্থিত হলে হাফিজের গজল তাকে সাকি হয়ে প্রেমের সরাব পান করিয়ে দেয়। দর্শনার্থী তখন হাফিজের মতই রোমান্টিকতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন।”  লেখকের লেখা পড়ে  মনে হয়েছে কথাটা একেবারেই মিথ্যে নয়। হাফিজের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে “জেহরা সামসের” সাথে সাক্ষাৎ।  লেখক আগাগোড়া একজন সিরিয়াস মানুষ কিন্তু হাফিজের দেশে এসে আর ওমন সুন্দরী নারীর মুখচ্ছবি দেখে সেই সিরিয়াস মানুষটিই হাফিজ শিরাজী হতে চাইছেন।  শুধু তাই নয় কবিতা বিমুখ লেখক হাফিজের গজল ধার করে তোতা পাখির মতো করে মনে মনে বলে উঠলেন,

 

“গালে-কালো তিল সেই সুন্দরী

বোখারা তো ছার, সমরখন্দও

খুশি হয়ে তাকে দিব উপহার। ”

 

 

পাঠক লাইনগুলো  পড়ার পর এই ভেবে আস্বস্ত হবেন যে,  এখন বোখারা আর সামারকান্দের সেই জৌলুশ নেই, নেই তৈমুর লংও,  তাই কবিতাটি লেখার জন্য হাফিজের প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও আমাদের লেখক এখানে নিরাপদ।  তিনি যতবার ইচ্ছে তাঁর প্রেয়সিকে সামারকান্দ এবং বোখারা দিতে পারেন।

 

হাফিজের প্রেমের রেশ কাটতে না কাটতেই হামাদানে অপেক্ষা করছে আরেক প্রেম কাহিনী, যে প্রেমকাহিনী পুরো ভ্রমণ কাহিনীতে আলাদা ফ্লেভার এনে দেবে।  হয়তো পাঠকগণ ভ্রমণকাহিনীতে কোন এক অলেখা উপন্যাসের স্বাদ পেয়ে যাবেন।

 

সমগ্র বইটিতে দারুন সব মুখরোচক খাবারের বর্ণনা, পারস্যের ইতিহাস চর্চা, জনগণের আতিথেয়তা,  রাজনীতি, ধর্ম, জনগনের জীবনযাত্রা,  মুদ্রা ব্যবস্থা, আফিম –সব কিছুই বর্ণিত হয়েছে সাবলীলভাবে। মাঝে মাঝে সফরসঙ্গীদের হাস্যরস, ঠাট্টা পাঠককে নির্মল আনন্দ দেবে। একঘেয়েমি দূর করতে খৈয়াম, হাফিজ,  শেখ সাদী তাদের কবিতার পসরা সাজিয়ে আছেন।

 

ইমাম খোমেনি নেতৃত্বে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল যার ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন খুবই সংক্ষেপে অথচ চমৎকারভাবে বর্ণনা করে গেছেন।  তবে হতাশ হতে হয়েছে ২০১৫ সালে পি৫+১ বা নিউক্লিয়ার চুক্তি সম্পর্কে কোন তথ্য আসেনি, যেটা আনাটা জরুরি ছিল বলে মনে করি।

 

সমগ্র বইটতে সমালোচনা করার মত খুব বেশি উপাদান পাওয়া যায় না। তবে বিষয়ভিত্তিক ছবিগুলো সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে সংযুক্ত করলে বিষয়টি আরও ভালো হতে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পৃষ্ঠা ছিল দারুণ উপভোগ্য।  ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে লেখকের ইতিহাস চর্চা পাঠককে বিনোদন দেবার পাশাপাশি জ্ঞানের খোরাক যোগাবে।  মোদ্দা কথা, বাংলা ভাষী পাঠকগণ যাদের ইরান নিয়ে আগ্রহ রয়েছে,  তারা নিঃসন্দেহে বইটিকে গ্রহণ করে এর রস আস্বাদন করতে পারেন।

 

পুরো পারস্য না দেখার আফসোস লেখক পারস্যের মহান কবি ও দার্শনিক ওমর খৈয়ামের রুবাই দিয়ে ঢাকতে চেয়েছেন, যা সত্যি লেখকের সাহিত্য মননের পরিচয় বহন করে,

 

“নগদ যা পাও হাত পেতে নাও

বাকীর খাতায় শূন্য থাক….”

 

 

ইরান যেমন দেখলাম

লেখক: ব্রি. জে. (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশক: পালক পাবলিশার্স

প্রথম প্রকাশ ২০২০

পৃষ্ঠা: ২৯২

দাম: ৪৫০

শ্রেণি: ভ্রমন কাহিনি

 

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *