উল্কা: রুশিয়া জামান রত্না

১.
অনেকক্ষণ ধরে তার সামনে বসে আছি, মুখোমুখি। তিনি খুব সিরিয়াস একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছেন আর আমিও বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে তার সরু পাতলা ঠোঁটের দিকে সটান তাকিয়ে আছি।যদিও মাঝে মাঝে তার ঈগলের মতো চোখগুলোতে আমার ভীরু কম্পমান চোখ রাখার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
: Are you ok?
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন। হঠাৎ এমন প্রশ্নের জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। দ্রুত চোখ নামিয়ে উত্তর দিলাম –
: Yes! I’m ok. Plz carry on…

এবার তিনি গালদুটুতে দুহাত রেখে আবার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।মনে হচ্ছিল, আমার চোখে মুখে বইয়ের পাতার মত লেখা ভেসে উঠেছে আর তিনি খুব মনোযোগ সহকারে লেখাগুলো পড়ছেন। আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে চোখ নামিয়ে নিতেই তিনি বলে বলে উঠলেন —

: Nope. You are not in yourself Suhi…

যদিও আমার নাম সোহেলী কিন্তু তিনি কখনোই আমাকে এই নামে ডাকেননি। তার সাথে পরিচয় হবার পর থেকেই তিনি আমাকে “সুহি” নামে ডাকেন। “সুহি” নামটি আমার কাছে ভারী মিষ্টি লাগে, খুব আদুরে নাম। আমিও তার একটি নাম দিয়েছি কিন্তু কোনদিন সে নাম ধরে তাকে ডাকা তো দূরে থাক, সাহস করে বলতেও পারিনি যে আমিও তার জন্য একটি নাম রেখেছি । মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, তার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলি —
: আপনাকে একটিবার “অভি” নামে ডাকি? আমায় সে অধিকার দেবেন?

অভি, আমারই গড়া আমার স্বপ্ন পুরুষ। আমি নিজ হাতে তাকে গড়েছি ভালোবাসবো বলে। আমার ডায়েরির ভেতর ওর বিচরণ। তাহেরের কাছ থেকে কষ্ট পাবার পর জীবনে আর কখনও প্রেমে পড়বো না বলে পণ করে বসলাম। কলেজ জীবন শেষ করে ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবি সুফিয়া কামাল হলে হলো আমার নতুন ঠিকানা। গ্রাম থেকে গিয়ে ঢাকা শহরের ঐ নতুন পরিবেশে কিছুতেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলাম না। তার উপর ভর করলো প্রচন্ড নিঃসঙ্গতা। ঠিক তখনই একদিন প্রিয় ডায়েরির পাতায় লিখলাম —

“অভি, তোমার মত কি কেউ হতে পারে? ঠিক যেমনটা আমি চাই। লম্বা, গায়ের রং শ্যামলা, সরু পাতলা ঠোঁট , ঈগলের মত তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি, সুন্দর ঘন চুল। বাইরে দারুণ সিরিয়াস একজন মানুষ কিন্তু আমার কাছে ভীষণ রোমান্টিক একজন প্রেমিক।প্রচন্ড বুদ্ধিমান আর কাজের প্রতি ভীষণ ডেডিকেটেড। নিজ কর্মক্ষেত্রে হিংস্র বাঘের মত তবে আমার আদর পেলে একদম বোকাবনে যাবে। আমার জন্য খুব সকালে একগুচ্ছ লাল টকটকে গোলাপ হাতে হলের গেটের বাইরে অপেক্ষা করবে কিংবা আমার জন্মদিনে দারুন কিছু কবিতার লাইন লিখে আমাকে সারপ্রাইজ দেবে! যে কিনা হবে আমার সোলমেট (Soulmate)। ডেটিংয়ে গিয়ে যার সাথে আমি আলোচনা করবো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতার অমিত-লাবণ্যকে নিয়ে, না হয় শরৎ বাবুর দেবদাস। কিংবা ইসরায়েলের মত দেশ কি করে আরব ভূমিতে টিকে আছে, কেনই বা আরব বিদ্রোহ হলো? যে আমাকে গল্প বলে প্রাণ খুলে হাসাতে পারবে আবার সোহরাব-রুস্তমের গল্প বলে বুকের ভিতরে হাহাকারের জন্ম দেবে। আমাকে বুকে টেনে এলোমেলো চুলগুলো যে আঙুলের ডগা দিয়ে ঠিক করে দেবে!!!”

: Are you listening?

হঠাৎ তার গলার স্বর শুনে আমি চমকে উঠলাম। তার দৃষ্টি তখনও আমার দিকে নিবদ্ধ। আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু শুকনো ঠোঁটে হাসতে গিয়ে হাসতে তো পারলামই না উপরন্তু ঠোঁটগুলিতে কিঞ্চিৎ যন্ত্রণা হলো।
: Yes! Of course, I am listening.

আমি জবাব দিলাম।
:তুমি কি পড়তে এসেছো না আমাকে দেখতে?
এমন অকপট প্রশ্নে আমি বেশ বিব্রত হলাম। কি উত্তর দেব খুঁজে পাচ্ছি না। ড্যাবড্যাব চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মনের মধ্যে সুনামি, সব কিছু তোলপাড় করে দিচ্ছে। এমন একটি মুখ, এমন ব্যক্তিত্বকেই তো ৩ টি বছর ধরে মনের ভিতর ধারণ করে যাচ্ছি। তাহলে, ইনি কি সেই মানুষ যাকে আমি এত বছর ধরে খুঁজছি!!
: চোখ নামও।
তিনি চাপা স্বরে বললেন।
: জ্বি৷ কি বললেন?
: বলেছি চোখটা নামাও। তোমার তাকানো ঠিক নেই। চোখের ভাষায় একটি স্পেশাল ম্যাসেজ পাচ্ছি।
মুচকি হেসে তিনি বললেন। আমি লজ্জা আর কিছুটা ভয়ে চোখ নামিয়ে নিতেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
: চলো। এবার যাওয়া যাক। অনেকক্ষণ ধরে আছি। ইউনিভার্সিটিতে এতটা সময় আমি থাকি না। বাসায় গিয়ে লাঞ্চ করবো।
গাড়ির চাবি, ফাইল, বইপত্র গোছাতে গোছাতে তিনি কথাগুলো বললেন।
আমি নিঃশব্দে ব্যাগ কাঁধে তুলে তার পিছন পিছন যাচ্ছি আর ভাবছি–
: ইশ!! কতটা বোকা আমি। কেন উনার সামনে এতটা ইমোশনাল হয়ে পড়ছি৷ কি ভাববেন? নাহ্! নিজেকে আর শক্ত হতে হবে৷

২.
*Come out Honey. I’m waiting.* মোবাইলে টেক্সটটি আসতেই আমি প্রায় ছুটে হলের গেট পার হলাম। শীতের সকাল। চারিদিকে ভীষণ কুয়াশা। গেটের দারোয়ান চেয়ারে বসে আরামে ঝিমাচ্ছে।
সুফিয়া কামাল হলের সামনে একটি ফুটওভার ব্রিজ। তার নীচে নীল রংয়ের গাড়ি নিয়ে তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখেই মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো। গাড়িতে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলাম-
: কেমন আছো অভি ?
:হুমম, ভালো। তুমি কেমন আছো সুইটহার্ট?
:হ্যা। ভালো আছি।

গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
: রুম থেকে বের হতে কোন অসুবিধা হয়েছে?
আমি মাথা নাড়িয়ে না বললাম।

শীতের সকালের গুচ্ছ গুচ্ছ কুয়াশা ভেদ করে গাড়ি ছুটে চলেছে আর তিনি আমাকে মজার মজার সব গল্প বলে হাসাচ্ছেন। হাসতে হাসতে গাল দুটু ব্যথা হয়ে যাবার উপক্রম। হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে তিনি বললেন,
: বাঁ, দিকে তাকাও।

বাঁ দিকে তাকাতেই আমার চোখ চকচক করে উঠলো। কি সুন্দর একটি নদী। এমন শান্ত স্নিগ্ধ সকালে এমন সুন্দর পরিবেশ, নদীর ধারের সবুজ ঘাস, ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু সব মিলিয়ে ভয়ানক সৌন্দর্যময় আবহ, আমাকে যেন মাতাল করে দিল।
তার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন-
: ঐ যে দেখো পানি। সুহি! তুমি না নদী খুব পছন্দ করো। গাড়ি থেকে নামবে কি? আচ্ছা থাক বাইরে ভালোই শীত মনে হচ্ছে । নামতে হবে না। আমি বরং কাঁচ নামিয়ে দিচ্ছি। তুমি নদী দেখো।
: তুমি কি করে জানলে, আমি নদী পছন্দ করি?
: হুমমম, প্রেমে পড়লে জানতে হয়।

আমি মুগ্ধ হয়ে সকাল বেলার অতুলনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করছি আর ভাবছি তিনি কি সত্যি আমার অভি?

সেদিন উনার অফিসে ভুলে আমার প্রিয় ডায়েরিটা ফেলে এসেছিলাম।ডায়েরিটা নিয়ে গেছিলাম তার একটি অটোগ্রাফ রাখবো বলে। কিন্তু অসাধানতাবশত, ডায়েরি আর ব্যাগের ভেতর নেয়া হয়নি৷ ফলে, যা হবার তাই হলো। ডায়েরি গিয়ে পড়লো তার হাতে। সেখান থেকে বের হলো তার বেশ কয়েকটি ছবি। এতে তার কৌতূহল তৈরি হলো আর আমার কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে ডায়েরিটা পড়ে শেষ করে আবার ফেরত দিলেন। শুধু পড়েছেন বললে ভুল হবে৷ আসলে তিনি মুখস্থ করে ফেলেছেন বৈকি। আমার সব পছন্দ, সপ্ন, আশা আকাঙ্খা তিনি পূরণ করে যাচ্ছেন। আমার সাথে “অভি” হয়ে দিব্যি অভিনয় করে যাচ্ছেন। যেহেতু তিনি নিজেকে “অভি”ই ভাবছেন তাহলে আমিও তাকে অভি বলেই ডাকবো।

৩.
অভির খুব সুন্দর একটি পরিবার আছে। আমি জানি অভি ভালোবেসে বিয়ে করেছিল যদিও প্রথমদিকে আমার কাছে কথাটি একেবারেই চেপে গিয়েছিল। কিন্তু বহুদিন পর একদিন কথার ফাঁকে বলে ফেলে। আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম –
: তাহলে আমার সাথে কি করছো?
: লাভ করছি। কাউকে ভালোবাসলেই তো অন্য কাউকে ভালোবাসা যায়। তাই নয় কি?
: মানে?
: আমি তোমাকেও ভালোবাসি৷

সংসার জীবনের যাঁতাকলে অভির জীবন যে বিষিয়ে উঠেছিল তা আমি বুঝতে পারতাম। ও আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছিল। আমি ওকে যা খুশি বলতে পারতাম, যা ইচ্ছে আবদার করতে পারতাম। ধীরে ধীরে দুজনেই যে কখন এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। ও ছিল আমার সোলমেট, আমার অস্তিত্বের আরেক নাম। সকালে ঘুম ভাঙতো ওর পাঠানো দুষ্টু- মিষ্টি মর্নিং উইশ দিয়ে তারপর সমস্ত দিন ওর সাথে ম্যাসেজ আদান-প্রদান। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও ওকে জানাতাম। দুজনের মাথা বিগড়ে গেলে, গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম। আড্ডা, গল্প আর পড়াশোনা শেষে যে যার বাসায় ফিরতাম। সঙ্গে নিয়ে আসতাম চমৎকার কিছু সুখকর স্মৃতি আর সুখানুভূতি।আসার সময় অভি আমার জন্য নিয়ে আসতো আমার প্রিয় ডার্ক চকোলেট আর আমি নিয়ে যেতাম ওর পছন্দের বই কিংবা দামী কলম।

আমাদের সম্পর্ক ছিল সব সম্পর্ক থেকে ভিন্ন। সবগুলো সম্পর্কের সংমিশ্রণে একটি অদ্ভুত ধরনের নতুন সম্পর্ক যেখানে সবকিছুই ছিল, তবে দুজনের কেউ কখেনোই শারীরিক কামনার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি। আমার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার নিয়ে অভি দারুন সচেতন আর আমিও ওর গবেষণাপত্র, ক্লাস, সেমিনার নিয়েও ছিলাম বেশ আগ্রহী। মাঝে মাঝে ঝগড়াও হতো। আবার কিছুক্ষণের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যেত।ঝগড়াঝাটি ভুলে আড্ডায় মেতে উঠতাম।

৪.

কৃষক পরিবারে আমার জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম বেশ মেধাবী। পড়াশোনার প্রতি ছিল খুব আগ্রহ। বাবা কোনদিনই চাননি আমার পড়াশোনা বন্ধ হোক। কিন্তু জায়গা জমিও তো নেই যে ওগুলো বিক্রি করে পড়াশোনা করাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবার পর চোখে সর্ষে ফুল দেখলাম। ভেবেছিলাম হয়তো পড়াশোনা আর হবে না, আর ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করা সেতো অসম্ভব। হঠাৎ কোথা থেকে কি হলো, বাবা এসে বললেন –
: কোন চিন্তা কইরো না মা। তুমি ঢাকায় ভর্তি হও ব্যবস্থা একটা হইবোই। আল্লাহ ভরসা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো!!! — এ কথা ভাবতেই শরীরে একটি শিহরণ খেলে গেলো৷ আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম —
: আব্বা, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো?
বলেই ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলেছি, বাবাও কাঁদলেন।
ঐ সময় একবারে জন্যও জানতে চাইনি, কি করে এতগুলো টাকার ব্যবস্থা হলো, কোথায় পেলো?
আমার বাবার কাছে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাটাই তখন মূখ্য ছিল সেটা আমি জানতাম। তার প্রতি ছিল আমার অগাদ বিশ্বাস। বাবা প্রতি মাসে আমাকে যে টাকা পাঠাতেন তা দিয়ে আমার দিব্যি চলে যেত। “টাকা কোথায় পেয়েছো?” জিজ্ঞেস করলেই বলতেন-

: ও চিন্তা তুমার করা লাগবো না। তুমি খালি মন দিয়া পড়বা। আমি চুরি করি বা চামারি করি তা তুমার দেখার বিষয় না। তুমি খালি সামনের দিকে খেয়াল করবা। একটা সরকারি চাকরি পাইলেই যথেষ্ট।

আমিও আর কথা বাড়াতাম না।মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতাম আর আমাকে গাইড করার জন্য অভিই ছিল যথেষ্ট।পড়াশোনা শেষ করেই সরকারি কর্মকর্তা হতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। চাকরিটা পেয়েই মনে মনে একটি পরিকল্পনা তৈরি করলাম। জীবনে কোনদিন বিয়ে করবো না। তাহের ছিল আমার অপরিণত বয়সের ছেলে মানুষী তাই প্রথম দিকে কষ্ট পেলেও ধীরে ধীরে ও আমার মন থেকে মুছে গিয়েছে। কিন্তু অভি? ও তো নিছক আমার প্রেমিক বা বন্ধু নয়। ও আমার সোলমেট। আমার নিকষ কালো আধাঁর রাতের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। জীবনে কারো কাছে পাত্তা না পাওয়া এই আমাকে অভি ওর সম্রাজ্যের রাণী করে রেখেছিল। আমার ডায়েরিতে লেখা প্রতিটি অপূর্ণ বাসনা পূরণ করেছে। হয়তোবা ভালোও বেসেছে। সত্যিই কি ভালোবেসেছিল নাকি অভিনয়?
হোক অভিনয়!!! সেটাই বা আমার কাছে কম কি? আমার উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির পরশ দিয়ে যে আমাকে তৃপ্ত করেছে তার নাম *অভি*।

৫.
বাড়িতে ফিরলাম বীরের বেশে। আমার নামের সাথে নতুন একটি পদবী যোগ হয়েছে “সরকারি অফিসার”। বাড়িতে পা রাখতেই হুরমুর করে লোকজন আসতে শুরু করলো । এই আমি যেন আর আগের আমি নেই। সন্ধ্যার পর বাবার সাথে একজন ভদ্রলোক এলেন আমার সাথে দেখা করতে৷ লোকটিকে আমি চিনি। আমার বাবার কোন এক ঘনিষ্ঠ আত্নীয়ের ছেলে। বয়সে আমার চেয়ে কম করেও ১৫ বছরের বড় তো হবেনই। ছোটবেলায় উনার বাবা মারা গেছেন বিধায় পড়াশোনা তেমন করতে পারেননি। তবে তিনি বেশ পরিশ্রমী আর সৎ মানুষ। আমার বাবা তাকে ছেলের মতো দেখেন। আমি যখন খুব ছোট তখন থেকেই উনাকে বহুবার আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করতে দেখেছি।নাম — জহির আলম। এখন বেশ বড় ধরনের ব্যবসায় জড়িত আছেন। কোনদিন আগ বাড়িয়ে তাকে কোন কথা বলতে শুনিনি। আমিও খুব একটা বলিনি। তাকে এমন অসময়ে আসতে দেখে আমি কিছুটা অবাক হলাম।
: মা, সোহেলী।আজ তোমারে কিছু কথা বোলমু।

বাবার এমন সিরিয়াসনেস দেখে আমি চুপ হয়ে গেলাম। বাবা একে একে বহু কথার অবতারণা করে আসল কথায় হাত দিলেন। আমি এতদিন যে পড়াশোনা করেছি তার সবটাই দিয়েছেন এই জহির সাহেব আর শুধুমাত্র আমাকেই নয় আমার এই দরিদ্র পরিবারকে আগলে রেখেছেন বড় সন্তানের মত। বিনিময়ে শুধু আমাকে চাইছেন, অন্য কিছু নয়।

তখন বুঝতে পারলাম, বাবা কেন আমাকে সরকারি চাকরির জন্য এতটা চাপ দিতেন। কেন বলতেন না, আমার পড়াশোনার খরচ কোথা থেকে আসে!!
আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এলো। এ কি করে সম্ভব? এই লোকটিকে কি করে আমি স্বামী বলে মেনে নেব?
জহির সাহেব চলে যাবার পর বাবাকে বললাম-
: আব্বা, আমি তো এখন একটি সরকারি চাকরি পেয়েছি। যদি উনার টাকা ফেরত দেই…?

কথা শেষ করার আগেই বাবা অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। মা পাশ থেকে কড়া ভাষায় খেকিয়ে উঠলেন–

: বেঈমানের দল! খাটাশ মার্কা শয়তান মেয়ে কোথাকার! তোর চৌদ্দ গুষ্ঠীতে ম্যাট্টিক পাশ নাই। জহির যদি তোর পড়ার খরচ না দিত তাইলে তো একটা প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার হইতি কি না সন্দেহ । দেখছো!! তোমার মেয়ের কথা শুনছো…

: তুমি যদি রাজি না হও, তাইলে আমাগো পরিচয় আর দিও না মা!! তুমি বহুত বড় হইছো। আমাগো আর তুমার না হইলেও চলবো।
কথাটা বলেই বাবা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

৬.
আজ আমার বাসর রাত। আমার ডায়েরিতে আমার বাসরঘর নিয়েও লিখেছিলাম। আদর করার সময় অভির চুলে আর ঘাড়ে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে ওর কানে ফিসফিস করে বলবো–
:অভি! অভি!! অভি!!!

অভি হয়তো জানে না, আমি বাসর ঘরে ওর জন্যই অপেক্ষা করছি। জানি ও আসবেও না, তবুও।
ও তো উল্কা। আমার কষ্টমাখা অন্ধকার জীবনে অভি এসেছিল উল্কার মতো। খানিক সময়ের জন্য আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে আমাকে আলোকিত করেছিল, মুগ্ধ করেছিল। ওর আলোয় আমি হেসেছি, আমার অন্ধকার জগতকে দেখেছি। এরপর ওর আলো নিভে গেল। উল্কাপিন্ডের পতন হলো। আমার জগতের সবটা আবার অন্ধকারে ঢেকে গেছে। শুধু হৃদয়ের এক কোনে ঢিবঢিব করে পুড়ে পুড়ে জ্বলছে অভির ফেলে চাওয়া স্মৃতির সলতে।

দু’চোখ চৈত্র মাসের শুষ্ক ভূমি হয়ে আছে। পুড়ে খাক। এক ফোঁটা জলও নেই ওতে। জহির দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতেই আমার সমস্ত শরীর বরফ শীতল হয়ে এলো। আমি জানি না এরপর কি হয়েছিল। হঠাৎ চোখ খুলে দেখি, আমার বুকের উপর একজন পুরুষ মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে আর্তনাদ করে নিজের অজান্তেই তার কানে ফিস ফিস করে বলে উঠলাম —
: অভি!!!
শব্দটা তার কানে যাওয়া মাত্র আমার কাছ থেকে সে ছিটকে গেল৷ তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম —
এ… তো জহির!!!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *