উৎসর্গ: রুশিয়া জামান রত্নার ছোটগল্প

১.

ঘড়িতে সময় ৯টা বেজে ৫০ মিনিট। ক্লাস শুরু হতে আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি আছে অথচ আমি এখনও অপরাজেয় বাংলা পেরোতেই পারিনি। বলতে গেলে এক প্রকার দৌড়ে কলাভবনের চারতলায় উঠলাম। সিদ্দিক স্যারের ক্লাস ৪১১ নম্বর রুমে। ঢাকা শহরের রাস্তায় কি পরিমাণ ট্রাফিক জ্যাম তা কারো অজানা নয় তবুও সিদ্দিক স্যারকে কোন অজুহাত দিয়ে রক্ষা পাওয়া যায় না। তার কাছে ১০ টা মানে ঠিক ১০টা।প্রথম ক্লাসেই তিনি এ বিষয়ে আমাদের সাবধান করে দিয়েছেন। বলেছেন—

 

: আমার ক্লাসে নির্দিষ্ট সময়ের ১ মিনিট পরেও কেউ ঢুকবেন না আর ক্লাস শেষ হবার ১ মিনিট আগেও কেউ বের হবেন না। তবে হ্যাঁ, শতভাগ ক্লাস না করেও আপনারা পরীক্ষা দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে আমি কাউকে  আটকাবো না।

 

দীর্ঘ ৪৫ মিনিট তিনি একাই কথা বলে গেছেন, আমরা সবাই চুপচাপ বোবা শ্রোতা হয়ে শুধু শুনে গেছি। সিদ্দিক স্যার অসম্ভব মেধাবী একজন মানুষ। তাঁর ক্লাসে বিনা কারণে কেউ উপস্থিত হবে না এমনটা কোনদিনই হয়নি।  ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা, চরিত্র, তত্ত্ব তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেন তাতে মনে হবে যেন চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছি। ইতিহাস নিয়ে বিমুখ ছাত্রটি যে কিনা বাধ্য হয়ে এই ডিপার্টমেন্টে ভর্তি সেও সিদ্দিক স্যারের ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকে।

 

সিদ্দিক খান অভি,  ডিপার্টমেন্টে সবাই তাকে ডাকি SK স্যার নামে। ইতিহাসের প্রতি এমন ডেডিকেটেড একজন মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। ইতিহাস নিয়ে তাঁর দক্ষতা এতই যে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হবার পরদিনই  চেয়ারম্যান স্যার তাঁকে ডিপার্টমেন্টে ক্লাস নেবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। প্রায় দু’বছর ভিজিটিং টিচার হিসেবে থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট তাঁর চাকরি পাকাপোক্ত করে। নীল-সাদা কোনটাই তাঁকে টানতে পারেনি, তাঁর টান ছিল শুধুই ইতিহাস।

 

এসকে স্যার এখনও বিয়ে করেননি। অবশ্য এই বয়েসে বিয়ের অত তাড়াও নেই। ত্রিশ না পেরুলে তাকে নাকি বিয়ের বয়স বলা চলে না।

 

দেরি করে ক্লাসে আসার ফলে জায়গা হলো পেছনের একটি বেঞ্চে। ওখান থেকে ঠিকভাবে বোর্ড দেখাই যায় না। স্যার ক্লাসে ঢুকে একটু ভ্রু কুঁচকিয়ে চারপাশে তাকালেন। মনে হচ্ছিল, কাউকে যেন মনে মনে খুঁজচ্ছেন।

আমি সাধারণত সব সময় প্রথম বেঞ্চে বসি। কিন্তু আজ বাসে দেরি হওয়ায় পিছনে বসেছি। স্যারের ক্লাস করছি প্রায় দু’বছরের বেশি। কিন্তু এমন করে ক্লাসে কাউকে খোঁজা আমার চোখে পড়েনি। হঠাৎ স্যার বললেন-

: আচ্ছা, সোহেলী নামের মেয়েটি কি আজ আসেনি?

 

বুকের ভিতরে ধুপ করে উঠলো। স্যার আমাকে খুঁজচ্ছেন? তড়িঘড়ি করে দাঁড়িয়ে বললাম –

: জ্বি স্যার।

: ওহ! ক্লাস শেষে আমার সাথে একটু দেখা করো। কেমন?

: জ্বি স্যার।

বলেই চুপচাপ বসে পড়লাম। মনে মনে হাজারটা  চিন্তা ঘুরতে লাগলো৷ স্যার আমাকে কেন ডাকলেন।

 

২.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায়  ‘খ’ বিভাগে প্রথম  হয়ে আমি যখন ‘ইতিহাস’  বিভাগে ভর্তি হলাম তখন ক্যাম্পাসে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। বিষয়টি অবাক করার মতই। অনেকে টিপ্পনী কেটে বলেছে-

: নিশ্চিত, ও ইংরেজি ভয় পায়!!!

 

আবার কেউ কেউ বলেছে–

: বুঝলি, আসলে ওর বিদ্যার জোর ঐ মুখস্থ পর্যন্তই।

 

আমি এগুলো শুনে হেসেছি কারণ যারা এসব বলছে তারা কেউই ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চেনে না। অথচ ওদের কথা শুনলে মনে হয় আমার চেয়ে ওরাই আমাকে ভালো চেনে। বাঙালি জাতি বোধ হয় পৃথিবীর এমন এক অদ্ভুত জাতি যারা নিজের চেয়ে অন্যকে নিয়ে বেশি ভাবে।

 

:স্যার, আমি কি আসবো?

রুমের দরজা ঠেলে  মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

স্যার মনে হয় আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। বললেন –

: হ্যাঁ, এসো সুহি।

 

সুহি!!! এই নামে তো কেউ আমাকে ডাকেনি।  আমার ডাক নাম সোহা যেটা স্যারের কোনভাবেই জানবার কথা নয়। যতটা সম্ভব নিজের এলোমেলো ভাবনা ধামাচাপা দিয়ে শান্ত হয়ে বসলাম।

: Thank you Sir

 

:সুহি, তোমার দাদার নাম কি মিঃ সাবেদ?

:জ্বি স্যার। তিনি সাংবাদিক ছিলেন। ইতিহাস নিয়ে তার দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তার বিশাল স্টাডি পুরাতন বই পত্র আর পেপারে ভর্তি। তা ছাড়া দাদুর নিজস্ব কিছু লেখালেখির ডায়েরি আছে।

খুব আগ্রহ নিয়ে স্যারকে বিস্তারিত খুলে বললাম।

:হুম। এখন বুঝতে পারছি ‘খ’ ইউনিটে ফার্স্ট হওয়া মেয়েটি কেন ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হলো। তুমি তোমার দাদুর মতো হয়েছো তাই না?

: জ্বি স্যার৷ একদম তাই। আমার স্বপ্ন দাদুর রেখে যাওয়া লেখালেখিগুলো নিয়ে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ।

: বাহ! খুব ভালো সুহি। এবার শোন তোমাকে একটি বিষয় শেয়ার করছি, মনোযোগ দিয়ে শুনবে। তোমার আবার কোন তাড়া নেই তো?

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখতে দেখতে স্যার বললেন।

: না স্যার। আপনি বলুন প্লিজ।

:আমি দেশের খুব সেনসেটিভ ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছি। তুমি তো জানোই নীল-সাদা কোন রং-এর প্রতি আমার দুর্বলতা নেই। আমার দায়বদ্ধতা ইতিহাসের কাছে, আগামী প্রজন্মের কাছে। আমার উপর যত প্রেসারই আসুক না কেন কিংবা কোন গোষ্ঠী যতই রুষ্ট হোক না কেন গবেষণা করে সত্য ইতিহাস আমি তুলে ধরবই।  বুঝলে সুহি, দেশটা এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। যে কোন মুহূর্তে যে কোন কিছু ঘটে যেতে পারে৷  ইতিহাসের প্রতি অশ্রদ্ধা আর ইতিহাসকে রাজনৈতিক অস্ত্র  হিসেবে ব্যবহার করলে শুভ কিছু আশা যায় না।  আগামী প্রজন্মের জন্য কিছু করে যেতে পারলে সেটা হবে আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া।

 

কথাগুলো বলতে বলতে হয়তো স্যারের  দুচোখ চকচক করে উঠলো, দুপাশের চোয়াল বেশ শক্ত হয়ে উঠলো।  বুঝলাম, স্যারের ভিতরের সমস্তটা জুড়ে শুধুই ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা। সামনে রাখা পানির বোতল থেকে এক ঢোক পানি দিয়ে গলা ভিজিয়ে আবার কথা বলতে শুরু করলেন —

 

:ইতিহাসকে মনে প্রাণে ভালেবাসে, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ডেডিকেশন নিয়ে কাজ করবে এমন একজন সহযোগী আমার ভীষণ প্রয়োজন। এই মুহূর্তে একমাত্র “সুহি” ছাড়া অন্য কোন নাম আমার জানা নেই। Are you interested?

 

কথাগুলো কানে প্রবেশ করতেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি আমার চারপাশে ঘিরে ধরলো। আমি কি স্বপ্ন দেখছি।  আচমকা মনে হতো লাগলো পৃথিবী পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে। একমাত্র আমি আর স্যার ছাড়া কিচ্ছুটি নেই।

 

৩.

কিছুটা সংকোচ হলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, অভি মানে এসকে স্যারের প্রতি আমি অন্য রকম একটা টান অনুভব করতাম। স্যারের কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম৷ এতটা কম বয়সে স্যার এত কিছু জানেন!!!  শুধুমাত্র জ্ঞানের দিক থেকেই নয় নীতি নৈতিকতা নিয়েও স্যার সবার প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ডিপার্টমেন্টে আছেন শিক্ষক হিসেবে  প্রায় চার বছর ধরে আছেন। এ পর্যন্ত  কেউ তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোলেনি। সেটা যে কোন অভিযোগই হোক না কেন। এমন একজন ব্যক্তিত্বকে মনে মনে আমি যদি চেয়ে থাকি তবে তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়৷ আমার একলা থাকার ভুবনে তার মূর্তি গড়ে তোলাটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়।  এখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারোরই নেই এমনকি অভিরও না।

 

স্যারের রুম থেকে বের হয়ে সোজা ভার্সিটির বাসে গিয়ে বসলাম। বাস ছাড়তে আরও আধ ঘন্টা বাকি। স্যারের সাথে কাজ করতে আমি রাজি হয়েছি।  কিন্তু মাথার ভেতর আপাতত কাজের চেয়ে একটি শব্দ বারবার টেপ রেকর্ডারের মত বেজেই চলছে আর তা হলো — “সুহি”  !!!  এত আদুরে নামে কি করে ডাকতে পারলেন? ব্যাগের ভেতর মোবাইল ফোনটা কেঁপে উঠলো,  হয়তো কোন টেক্সট হবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা হাতে নিয়ে লক খুলে দেখি what’s app -এ ছোট্ট একটি টেক্সট —

: Hi Suhi, This is Ovi. Save this number plz.

 

অভি আর আমি ইতিহাসের এমন কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম যেগুলো দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত। আর গবেষণার ব্যাপকতায় তা কয়েকটি দেশের সাথেও জড়িয়ে যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই গবেষণার কাজ বেশ গোপনে করতে হচ্ছে। আমার দাদুর স্টাডিতেই ইদানীং আমাকে বেশি দেখা যায়। একটার পর একটা এলবাম ঘেঁটে ঘেঁটে নতুন কোন তথ্য পাওয়া যায় কি না তাই খুঁজে যাই। অভিও মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় এসে স্টাডিতে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় পার করে। বলা বাহুল্য, আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা বেশ গাঢ় হয়ে উঠেছে। এটাকে ঠিক প্রেম বলা যাবে না তবে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি। আমি লোক চক্ষুর আড়ালে স্যারকে অভি নামেই ডাকি আর তুমি করে বলি। প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হয়েছিল কিন্তু ওর এককথা-

 

:দেখো সুহি, দুজনের  লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, মতাদর্শ আর মন মানসিকতায় যদি অসম্ভব মিল থাকে বা একই রকম থাকে তবে বয়স, পদ-পদবী কিংবা ধর্ম বন্ধুত্ব তৈরিতে কোন বাঁধাই সৃষ্টি করতে পারে না।

 

আমি জানি না ঠিক কি কারণে কথাগুলো আমার বুকের ভেতর, ঠিক হৃদপিণ্ড বরাবর ধাক্কা দিচ্ছিলো। মনে হচ্ছিল, এই মানুষটি আমার খুব বেশি আপন কেউ। হয়তো  আমার সোলমেট (Soulmate)।

 

৪.

স্টাডিতে বসে আমি ডিপার্টমেন্টের পড়াগুলো নোট খাতায় তুলছিলাম। পাশে মোবাইল ফোন কর্কশ শব্দে বেজে উঠলো। স্ক্রিনে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ঢেউ খেলে গেলো। অভি আমাকে স্মরণ করেছে-

 

: হ্যালো, সুহি। কি করছো?

 

ওর গলাটা বেশ ভারী মনে হলো।

:এই তো স্টাডিতে।

: আমি যদি এখন গাড়ি পাঠায়ে দেই তুমি কি আসতে পারবে?

: এখন?  কি বলছো। এখন তো… রাত ৮ টার বেশি বাজে৷

দেয়ালক টাঙানো ঘড়িটা আড় চোখে দেখে আমি বললাম।

: হুম জানি। তবুও। I need you right now.  Plz..

:ওহ!! আচ্ছা ঠিক আছে। আমি রেডি হচ্ছি, তুমি গাড়ি পাঠাও।

 

মিনিট ২৫ এর মধ্যে গাড়ি বাসার সামনে চলে আসলো। এসি অন থাকা সত্ত্বেও আমি ঘেমে যাচ্ছিলাম। কি এমন হলো যে এক্ষুনি আমাকে যেতে হচ্ছে।

 

অভির মা বোধ হয় আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি আমাকে দেখেই বললেন –

:একটু দেখো তো মা, অভি কেমন অস্থির হয়ে আছে।

:জ্বি আন্টি। আমি দেখছি।

 

অভির স্টাডি রুমে গিয়ে দেখি ও ম্যাগনিফাই গ্লাস হাতে নিয়ে খুব পুরাতন কিছু পেপারস মনোযোগ দিয়ে দেখছে। আমি ডাকতেই চমকে উঠে তাকালো।  বললো-

: সুহি, এসছো? এই লেখাগুলো পড়ো তো।

অভির চোখ দুটো যেন রক্তজবা ফুল।  আমি ওর পাশে গিয়ে লেখাগুলো পড়তেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে বললাম-

: সর্বনাশ!!!  এই তথ্য কোথায় পেলে? এটা প্রকাশ হলে তো তোমার জীবনের উপর হুমকি আসবে।

:আসে আসুক। আমি ওসব পরোয়া করি না। যা সত্য আমি তাই লিখবো, তাই প্রকাশ করবো।

ওর কন্ঠে ইস্পাতের দৃঢ়তা।

: মানে?

আমি যেন আঁতকে উঠলাম।

:আমি এখন অক্সফোর্ডের হিস্টরি ডিপার্টমেন্টের ড. ফিলিপ হেইডকে ই-মেইল করবো। আমার মনে হয়, তিনি আমাকে আরও তথ্য উপাত্ত দিয়ে হেল্প করতে পারবেন।

: ড. ফিলিপ,  যিনি উপমহাদেশের জেনোসাইড নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাঁর  কথা বলছো?

:হুম। তিনি শুধু জেনোসাইডই নয় উপমহাদেশের ইতিহাস নিয়েও রিচার্স করছেন।

:অভি, আমার দৃঢ বিশ্বাস তুমি তেমার লক্ষ্যে একদিন ঠিকই পৌঁছাতে পারবে। Well done…

 

বাসায় ফেরার সময় গাড়িতে বসে বসে আমি ভাবছিলাম রাজনীতি কি করে ইতিহাসকে বদলে ফেলে। কোথায় যেন পড়েছিলাম, যে জাতির ইতিহাস নেই, সে জাতির ভবিষ্যৎ নেই। আমাদের ইতিহাস আছে তবে তা অনেকটাই বিকৃত। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছে মতো ইতিহাস বিকৃত করে, তৈরি করে, সময় সময় মুছে ফেলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠকিয়ে যাচ্ছে। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে দেশের বৃহৎ স্বার্থ এদের কাছে মূল্যহীন, অসার বস্তু মাত্র।

 

৫.

অভি লন্ডন গিয়েছে প্রায় বছর হতে চললো। অক্সফোর্ড থেকে ড. ফিলিপ ওকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণ উপেক্ষা করার নয়। তাই অভিও বেশ খুশি মনে আমার থেকে বিদায় নিলো। ওর থিসিস তত্ত্বাবধানে থাকছেন স্বয়ং ড. ফিলিপ হেইড। অভির থিসিস বাংলায়ও প্রকাশিত হবে “অক্সফোর্ড প্রেস” থেকে।

 

লন্ডন যাবার পর থেকেই অভি ধীরে ধীরে আমার থেকে দূরে সরে গেল। কারণটা আমি ফেসবুকের কল্যাণে জেনে গেছি। রানু নামের এক অসম্ভব সুন্দরী মেয়ের সাথে অভির হৃদয়ের লেনাদেনা হয়েছে। মেয়েটি শুধু সুন্দরীই নয়,  ভীষণ মেধাবী আর স্মার্ট। রানুর ছবির দিকে তাকালে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। ভেতরে ভেতরে আমি সূচ ফোটা বেলুনের মত চুপসে যাই। প্রথম প্রথম মনে হতো অভি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কিন্তু একসময় নিজেই নিজেকে বললাম —

: অভি তো কোনদিনই আমাকে বলেনি যে ও আমাকে ভালোবাসে,  আমিও বলিনি। তাহলে আমি কেন ওর উপর অভিমান করছি। আমি ওর জন্য যতটা না ডেডিকেট  তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ডেডিকেটেড আমার দেশের ইতিহাসের প্রতি। অভি তো চলে গেছে কিন্তু আমার দাদুর রেখে যাওয়া কাজগুলো তো আছে। আমি ওগুলো নিয়ে আবার গবেষণা শুরু করবো, প্রয়োজনে একা একাই শুরু করবো।

 

১ বছর পর,

 

: সোহেলী,  তোর একটি পার্সেল এসেছে অক্সফোর্ড থেকে।

বাবা, পার্সেলটি হাতে দিয়ে স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। পার্সেল খুলে দেখি ড. সিদ্দিক খানের লেখা একটি বই।  নাম- জানা অজানা (১৯৪৭-১৯৯০)

বইয়ের মলাটে হাত বুলিয়ে দিলাম, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকলাম। অভির স্পর্শ আর গন্ধ অনুভব করতে চাইছি৷ বইটির কৃতজ্ঞতা স্বীকারে কোথাও আমার নাম নেই। উৎসর্গ পাতায় চোখ পড়তেই দেখলাম –

 

উৎসর্গ,

রানুকে, যে আমার অনুপ্রেরণা!!!

 

 

x
error: Content is protected !!