চিরদিনের ইতিহাস: বনফুলের গল্প

 

নিরিবিলি দেখে হনু একটু নিশ্চিন্ত হয়ে গা চুলকোবার যােগাড় করছে, এমন সময়ে ওপরে আওয়াজ হ’ল-“হুম, হুম!” দিনদুপুর হলে কি হয় জায়গাটা বেজায় অন্ধকার, তাই হনু প্রথমটা দেখতে পায়নি। এবার চমকে এদিক-ওদিক চেয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে দে লাফ। এ-ডাল থেকে আর ডালে, সে-ডাল থেকে একেবারে আরেক গাছে। ওঃ, খুব ফঁড়াটা কেটে গেছে। আর একটু হলেই হয়েছিল আর কি! গেছাে পাচার অক্ষয় পরমায়ু হােক, দিন-কানা বলে আর কখনও হনু তাকে ক্ষেপাবে না।

শিকার ফসকে চকচকে ছুরির মতাে চোখ তুলে, চিতা একবার গেছাে পাচার দিকে তাকালে। ডালটা নাগালে পেলে একবার চুকলি খাওয়ার মজাটা দেখিয়ে দিত।

কিন্তু গেছাে প্যাচা হুতুম নির্বিকার–ধ্যানগম্ভীর বুদ্ধমূর্তি যেন। আধবোজা চোখের তলা দিয়ে চিতার দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে বললে—“কাজটা কি ভালাে হচ্ছিল বন্ধু—বিশেষ এই দিনদুপুরবেলা?” চিতা নীচ থেকে ফাস করে উঠল—“দিনদুপুরবেলা মানে?”

হুতুম গম্ভীরভাবে বললে—“মানে, আজকাল তােমরা বনের শাস্তর টাস্তর সব উল্টে দিলে কিনা! দিনরাতের বিচার আর নেই। অথচ তােমার ঠাকুরদা চাদনি রাতে পর্যন্ত রক্তপাত করত না।” । চিতা চটে উঠে গা ঝাড়া দিয়ে বললে—“রেখে দাও তােমার ওসব শাস্তর। শাস্তুর মানবার জন্যে উপােস করে মরতে হবে নাকি! ঠাকুরদা শাস্তুর মানবে না কেন! তাদের তাে আর আমার মতাে সাত সন্ধে নীরক্ত উপােস করতে হত না, ক্ষিধেয় পেট পিঠ একও হয়ে যেত না। তখন থাবা বাড়ালে কিছু না হােক একটা খরগােশও মিলত।”

হুতুম চোখ বুজেই বললে–“এত অধর্ম ছিল না বলেই মিলত।”

চিতা চটে কাই হয়ে উঠছিল ক্রমশ। চুকলি খাবার পর গেছাে প্যাচার এই ভ-ামি অসহ্য। কিন্তু ডালটা নেহাত উঁচু আর পলকা বলেই তাকে এবার একটা হাই তুলে সরে পড়তে হল। যাবার সময় শুধু একবার বলে গেল—“দিনের চোখ গেছে, রাতের চোখও যাক তাের!”

হুতুম কিছুই গায়ে না মেখে শুধু বললে—“হুম !”

খানিক বাদে আবার সাবধানে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে হনু এসে হাজির। মউতাতে গেছে প্যাচার চোখ তখন আবার বুজে আসছে।

হনু বললে—“দেখলে দাদা চিতার নেমকহারামিটা ! তুমি না থাকলে তাে সাবড়েই দিয়েছিল!”

হুতুম বাজে কথা বেশি কয় না, বললে—“হুম।” হনুর একটু বেশি কিচিরমিচির করা স্বভাব। সে বলেই চলল—“অথচ এই আর অমাবস্যায় ওর কি উপকারটা না করেছি? বারশিঙার জলায় মাছের লােভে গেছলেন। এদিকে বুড়াে ময়াল যে কাচ্চাবাচ্চা সমেত ওইখানেই আড়া গেড়েছে সে-খবর তাে রাখেন না। জামগাছ থেকে সাবধান না করলে সেই রাতেই হয়ে গেছল আর কি!”

হুতুমের কাছে কোনাে উত্তর না পেয়ে হনু আবার বললে—“আমিই প্রাণ বাঁচালাম, আর আমাকেই কিনা তাগ!” । হুতুম এবার চোখ তুলে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বললে—“এ তাে আর নতুন দেখছিস না বাপু। ও-জাতের ধারাই তাে এই। থাবায় যারা নখ লুকোয় তাদের আবার বিশ্বাস করে নাকি? হুম!”

হনু পিঠ চুলকে বললে—“কিন্তু কি করা যায় বলাে তাে দাদা! বনে তাে আর টিকতে দিলে না। এক দ- স্বস্তি যদি থাকে! একা রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর। গাছে চিতা, নিচে কেঁদো; দাঁড়াই কোথায়?”

হুতুম বললে—“হুম।”

হনু হতাশভাবে বললে—“একটি উপায় বাতলাতে পারাে না হুতুমদা! তােমার এমন মাথা!” মাথার প্রশংসায় খুশী হয়ে হুতুম বললে—“উপায় আছে, কিন্তু পারবি কি?”

“পারব না! খুব পারব। শুধু একা আমি তাে নয়, বনের সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এই তাে কাল কেঁদো বাগে পেয়ে কাকিনীর দফা রফা করেছে। বয়ার তাে রেগে আগুন হয়ে গেছে;ঘুরে বেড়াচ্ছে বুনাে মােষের পাল নিয়ে। একবার সুবিধে পেলে হয়।”

হুতুম তাচ্ছিল্যভরে বললে-“ওসব চারপেয়ের কর্ম নয়।”

 

হনু হুতুমের এই দুর্বলতাটুকু জানে। হুতুম আর সব দিকে খুব বিজ্ঞ, খুব ধীর। কিন্তু মানুষের মতাে দু-পায়ে হাঁটে বলে সেও যে মানুষের জ্ঞাতি তার এই ধারণার বিরুদ্ধে কিছু বললে আর রক্ষা নেই।

হনু নরম হয়ে তােষামােদ করে বললে—“দু-পেয়ে বলেই না তােমার কাছে আসি পরামর্শের জন্য।”

হুতুম খুশী হয়ে বললে-“তবে শােন। কিন্তু কথা আর কিছু হ’ল না। দূরের মাদারগাছের ডালের ওপর বুঝি একটা কেন্নোর মতাে পােকা একটু উঁকি মেরেছিল। শো করে একটা শব্দ হ’ল। তারপরেই দেখা গেল হুতুম উড়ে গেছে সেখানে।

হনু খানিক অপেক্ষা করল, কিন্তু হুতুমের আর দেখা নেই। পােকার খোঁজে সে তখন ডাল ঠোকরাতে ব্যস্ত। আর তার আশা নেই বুঝে হনু খানিক বাদে সরে পড়ল। হুতুমের মর্জির খবর সে রাখে।

‘তরঙ্গিয়া’র জঙ্গলে সত্যিই বড়াে গােলমাল। অবশ্য জঙ্গলে আর শান্তি কবে মেলে ? জঙ্গলের বাসিন্দারাও সে-কথা জানে না এমন নয়, তবু এত উপদ্রব তারা কখনও ভােগ করেনি। বনের ঘুপসি অন্ধকারে বসে শলাপরামর্শ চলে, শােনা যায় হা-হুতাশ, কিন্তু সব চুপিচুপি। কোথায় কেঁদো আছে ওত পেতে কে জানে! কে জানে কোন ডালে চিতা আছে ঘুপটি মেরে।।

এ-বছর ভয়ানক খরা। বারশিঙার জল ছাড়া সব জায়গায় জল গেছে শুকিয়ে, কিন্তু তেষ্টায় ছাতি ফেটে গেলেও সেখানে যাবার উপায় নেই। বাচ্চা-কাচ্চা সমেত বুড়াে ময়াল সেখানে আডডা গেড়েছে। তাদের যদি বা এড়ানাে যায় কেঁদোর হাতে নিস্তার নেই। কেঁদো একেবারে শেকড় গেড়ে বসেছে সেখানে। এর আগে এমন কখনও হয়নি। কেঁদো তখন বনে এসেছে, দু-দশটা মেরেছে আবার চলে গেছে অন্য বনে। এবার তারও যেন আর নড়বার নাম নেই। কিন্তু জল বিহনে আর কদিন থাকা যায়! তেষ্টায় পাগল হয়েই বুনাে মােষের মা কাকিনী গেছল মরিয়া হয়ে বারশিঙার জলায়। সেখানে পেছন থেকে পড়ল এসে ঘাড়ে কেঁদো। কাকিনী পিছল জমিতে পাশ ফিরতে না ফিরতেই গর্দান গেল ভেঙে।

। সেই থেকে বনের কেউ আর ঘেঁষতে চায় না সেদিকে। দুন’ পাহাড়ে চিকারার দল ছটফট করছে, জলে নামতে সাহস হয় না। কলজে ফেটেই কটা মরল। ঝাকাল হরিণের নতুন লােমের জৌলুস নেই—সেই ফ্যাকাশে হলদেই দেখায়। মেটে কালাে গাউজের দল ঘুরে বেড়ায় বনে-বনে। কালােয়ার গাউজকে দেখলে সত্যিই কান্না পায়। এই খরার দিনে জলে গারি’ নিতে না পেয়ে তার যা দুর্দশা!

কালােয়ার গাউজের বউ চুলানির সঙ্গে সেদিন হনুর দেখা। হাড্ডিসার চেহারা হয়েছে; গায়ের লােম গেছে উঠে।

বুনাে নােনাগাছে হনু ছিল ব’সে। চুলানি নিচে দিয়ে যেতে-যেতে ওপরে খসখসে আওয়াজ শুনে চমকে কান খাড়া করে দাঁড়াল। হনু তাড়াতাড়ি অভয় দিয়ে বললে— “না গাে না, চিতা নয়, হনু!”

হতাশভাবে চুলানি বললে—“আর চিতা হলেই বা কি! এখন চিতায় থাবা মারলেই হাড় জুড়ােয়। এ-যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।”

দরদ জানিয়ে হনু বললে—“অমন কথা বলতে আছে! এমন দিন কি আর থাকবে?”

ঢুলানি এ কথায় সান্ত¡না পায় না। বললে—“থাকবে বলেই তাে মনে হচ্ছে। কেঁদো আর চিতার কি মরণ আছে?”

হনু গম্ভীর হয়ে বললে—“আছে বৈকি, কিন্তু উপায় করতে হবে।” ঢুলানি একটু উৎসাহিত হয়ে বললে—“উপায় কিছু ঠাউরেছ নাকি?”

“সেদিন গেছলাম তাে হুতুমের কাছে। কিন্তু জানাে তাে ওদের চাল? গায়েই সহজে মাখতে চায় না।” । ঢুলানি ওপরদিকে চেয়েছিল এতক্ষণ, এবার বললে—“দুটো পাকা নােনা ফেলে দাও ভাই, জিভটা একটু ভিজুক, জলের তার তাে ভুলেই গেছি।”

হনু ক’টা পাকা দেখে নােনা ফেলে দিয়ে বললে—“আচ্ছা, ঝােপেঝাড়ে ঘােরাে, চন্দ্রচূড়ের দেখা পাও না, না-হয় কালকেউটের? ওদের ব’লে দেখলে বােধ হয় কাজ হয়; এক ছােবলেই কাবার।”

নােনা চিবােতে চিবােতে ঢুলানি বললে—“পাগল! ওরা কারুর উপকার করবে। বলতে গেলে আমাদেরই দেকে ছুবলে। সেই যে কথায় আছে—

পা নেই, বুকে হাঁটে ডিমের ছা মাকে কাটে।

—ওরা তাে আর মার দুখ খায় না।” হনু মাথা নেড়ে বললে—“তা বটে। তা না হলে বারশিঙার জলার বুড়াে ময়াল একদিন কেঁদোর গায়ে পাক দিতে পারে না? তা তো দেবে না—তার বদলে হাড় পাঁজরা ভাঙবে যত চিতল আর খাউট্রা হরিণের। নাঃ, হুতুমের কাছে একবার যেতেই হয় পরামর্শ করতে। বুড়ােটার যে দেখাই পাওয়া যায় না।” । চুলানি গাছের গায়ে দু-বার শিং ঘষে চলে যেতে-যেতে বললে—“কি হয় -হয় খবরটা দিও।”

হনু এক ডাল থেকে আর ডালে লাফিয়ে বসে বললে—“সন্ধ্যাবেলা ‘খলায় গেলেই পাব তাে?

। চুলানি বিষণ্ণভাবে বললে-“থলায় কি আর কেউ যায়? সে-আমােদের দিন গেছে। খবর দিও ‘দুন’ পাহাড়ের তলায়…” । চুলানি আরও কিছু হয়তাে বলত; কিন্তু হঠাৎ শােনা গেল কাছেই কেঁদোর কাশি। চুলানি মাথা তুলে পিঠে শিঙে ঠেকিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দিলে ছুট । হনু দুটো ডাল আরও ওপরে উঠে বসেছে ততক্ষণে।।

কদিন বাদে আবার হুতুমের সঙ্গে হনুর দেখা। সবে সকাল হয়েছে, আগের রাতে হুতুমের ভােজটা একটু ভালােরকমই হয়েছে মনে হ’ল। দু-চোখ বুজিয়ে গাছের কোটরে হুতুম যেন ধ্যানে বসেছিল।।

আগের রাত্রে নতুন শিঙের চামড়া ঘষে তােলবার সময় কালশিঙে’ চিতার হাতে মারা গেছে। হনু সেই খবরটা দুন’ পাহাড়ে চিকারার দলে প্রচার করবার জন্য তাড়াতাড়ি চলেছিল, হঠাৎ গাছের কোটর থেকে ‘হুম’ শুনে চমকে দাঁড়াল। । তারপর দেখতে পেয়ে বললে—“এই যে দাদা! কদিন ধরে তােমাকে বাদাম খোজা করছি।”

হুতুমের মেজাজটা আজ ভালাে, বললে-“কেন হে?”

“কেন আবার বলতে হবে? তােমাদের মতাে বিজ্ঞ, বুদ্ধিমান দু-পেয়ে থাকতে এ-বনে আমরা সবাই কি মারা পড়ব বলতে চাও। দোহাই হুতুমদা, একটা উপায় বাতলাও।”

হুতুম বললে-“হুম, বলবখনি।”

হনু অস্থির হয়ে উঠেছিল; বললে-“না, বলবখ’ন নয়, এখনই। তােমার দেখা তাে আর তপিস্যে করলেও মেলে না, এখন যখন পেয়েছি আর ছাড়ছিনে।” হুতুম বললে-“হুম, বলছি, উপায় তাে বলতে পারি, কিন্তু লাভ কি?”

“কি যে বলাে হুতুমদা, লাভ কি? এই নখ-চোরা দুটো মরলে আর আমাদের ভাবনা কি?”

হুতুম গম্ভীরভাবে বললে—“আর ভাবনা থাকবে না তাে?” “নিশ্চয়ই না।” হুতুম বললে—“হুম, তবে শােনাে। বারশিঙার জলা পেরিয়ে কসাড় বন ছাড়িয়ে যে দু-পেয়েদের গা——চিনিস?”

হনু বললে—“খুব চিনি, আমার ভাই খাটো ল্যাজকে সেখানেই তাে ধরে রেখেছে।”

হুতুম বললে-ূ-“হুম! সে-গাঁ থেকে দু-পেয়ে আনতে হবে।” হনু একটু হতাশ হয়ে বললে-ূূ-“বাঃ, তারা আসবে কেন?”

হুতুম বললে—“হুম, আসবে রে আসবে। দুন’ পাহাড়ের রাঙা নুড়ি দেখেছিস, ভােরবেলার সূর্যির মতাে লাল। সেই নুড়ির টানে আসবে।”

হনু শুনে তাে অবাক। বললে—“সে-নুড়ি তাে চোখে দেখেছি, না যায় সঁতে ভাঙা, না আছে কোনাে রস। সেই নুড়ি দিয়ে কি হবে দু-পেয়ের?”

হুতুম একটু চটে উঠে বললে—“তুই দু-পেয়ের হালচাল কিছু জানিস?”

হনু অগত্যা চুপ করল। হুতুম আবার বললে—“কসাড় বনের ধারে গারােবাদার পাশে দু-পেয়েরা আসে বেত কাটতে; তাদের সেই নুড়ি দেখাতে হবে।”

“কেমন করে দেখাব?”

“কেমন করে আবার দেখাবি! বেত-বনে নুড়ি ছড়িয়ে রেখে দিগে যা; এদিকওদিক আর কিছু ছড়াস। দু-পেয়ের চোখ সব দেখতে পায়।

হনু অবাক হয়ে বললে—“তা না হয় দেখল, কিন্তু আমাদের তাতে কি হবে? কেঁদো আর চিতাকে সামলাবে কে?” । হুতুম গম্ভীর হয়ে বললে—“সে-ভাবনা তাের কেন? যা বললাম কর আগে, তারপর বসে-বসে দেখ কি হয়। অতই যদি বুঝবি তা হলে গায়ে পালক গজাবে

হাজার হলেও হুতুম জ্ঞানীগুনী লােক। এ-ঠাট্টা নীরবে হজম করে হনু বললে -“তবে কুড়ই গে নুড়ি, কেমন ? ঠিক বলছ তাে হুতুমদা, এতেই হবে?” হুতুম শুধু বললে—“হুম।

তারপর ক’বছর কেটে গেছে। তরঙ্গিয়া’র জঙ্গলের আর সে-চেহারা নেই। জঙ্গল অনেক সাফ হয়ে গেছে। কত গাছ যে কাটা পড়েছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। দুন’ পাহাড়ের ওপরে আর নিচে কাঠের আর পাথরের বাসা। দু-পেয়েরা রাতে সেখানে ঘুমােয় আর দিনে পাহাড় কেটে খানখান করে। গােটা পাহাড়টাই বুঝি তারা ফেলবে খুঁড়ে।

হনুর আজকাল ভারি বিপদ। বন্ধুবান্ধব কেউ আর বড়াে তরঙ্গিয়া’য় নেই। তবু বন ছাড়তেও তার মন কেমন করে। তাই কোনােরকমে সে পড়ে আছে।

সেদিন হঠাৎ বাদামগাছে হুতুমের সঙ্গে দেখা। গাছপালা গেছে কমে; দিনের বেলা বনে আজকাল তেমন অন্ধকার হয় না। হুতুম তাই চোখে বড়াে কম দেখে। হনু ‘দাদা বলে ডাক দিতে প্রথমটা তাে চিনতেই পারল না।

তারপর মিটমিট করে খানিক ঠাউরে বললে—“কে হনু নাকি? আছিস কেমন ?”

হনু ম্লানভাবে বললে—“আছি আর কেমন দাদা।

হুতুম আবার চোখ বুজবার উপক্রম করছিল, হনু বললে-ূ-“তরঙ্গিয়া’র জঙ্গলের কি হাল হয়েছে দেখেছ তাে দাদা!”

হুতুম অবাক হয়ে বললে-“কেন কেঁদো আর চিতা তাে অনেকদিন মারা পড়েছে। সেই খরার বছরেই না!”

“তা তাে পড়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে আমরাও যে লােপাট হয়ে গেলুম। সারাদিন ঘুমােও, খোজ তাে আর কিছুর রাখাে না? ‘দুন’ পাহাড়ের চিকারার বংশে বাতি দেবার যে কেউ নেই। দু-পেয়ের যে-বাজ-লাঠিতে কেঁদো গেছে তাতেই চিকারার দফা রফা। গাউজদের যে-ক’টা বাকি ছিল কোন বনে যে গেছে কোনাে পাত্তা নেই। কঁকাল দু-একটা আছে এখনও, কিন্তু আর বেশি দিন নয়, বাজ-লাঠিতে গেল বলে। বুড়াে ময়াল পর্যন্ত তল্লাট ছেড়ে গেছে। দিনরাত গুড়ুম গুড়ুম, দিনরাত খটাখট । এ-গাছ পড়ছে, ও-গাছ পড়ছে। দু-দ- তাে আর স্বস্তি নেই।” হুতুম বললে-“হুম।”

“তােমার কথায় নুড়ি ছড়িয়ে প্রথমটা তাে ভালােই হ’ল। আজ দু-জন, কাল চারজন, দু-পেয়েরা ক্রমে ক্রমে ঝাকে ঝাকে আসতে লাগল তরঙ্গিয়া’য়। তারা কেঁদোকে মারল বাজ-লাঠিতে, চিতাকে ধরল ফাদে। আমরা তাে একেবারে স্বর্গ পেলাম হাতে। ওমা, তারপর আমাদেরই পালা কে জানত? ‘দুন’ পাহাড়ে তারা। যেদিন বাসা বাঁধল তারপর থেকেই আমাদের হ’ল সর্বনাশ! কেঁদো আর চিতা তবু একটা-দুটোর বেশি মারত না, এদের হাতে দলকে দল সাবাড়।” হুতুম গম্ভীর মুখে বললে—“হুম।”

“ভালাে করতে গিয়ে এ কি হ’ল বলাে তাে?” হনু কঁদো-কালো হয়ে বললে— “তরঙ্গিয়া’র এ-দশা তাে চোখে দেখা যায় না।”

হুতুম চোখ বুজে প্রশান্তভাবে বললে-“যা হবার ঠিক তাই হয়েছে; চোখ বুজে থাকতে শেখাে, কিছু দেখতে হবে না!”

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *