ডলি মনিরের গল্প: শিহাব

প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রণায় শিহাব সারারাত ঘুমাতে পারেনি, সকালে উঠে এলোমেলো ঘুরছে, ফটোকপির দোকানে যায়নি, একবন্ধুর সাথে পার্টনারশিপে দোকানটা চালাচ্ছে, একদিন না গেলে লস হয়ে যায়, পার্টনার বন্ধুটি টাকা নিয়ে তালবাহানা শুরু করে দেয়, মনে মনে ভাবছে চুলোয় যাক সবকিছু। একপর্যায়ে ভাবে মায়ের কাছে যাবে, যে ভাবা সেই কাজ, সাথে সাথে আরেক মহল্লায় চলে যায়, বড় বড় ইট দিয়ে মায়ের বাসার চালে ঢিল দিতে থাকে।

শিহাব যখন সাত কি আট বছরের তখন শিহাবের বাবা মার ডিভোর্স হয়ে যায়, পরবর্তীতে শিহাবের মা পঞ্চাশোর্ধ্ব তিন সন্তানের বাবাকে বিয়ে করে এখানেই থাকছে। সন্তানেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী, টিনসেড বিল্ডিংটায় দুজনেই থাকে।
ঢিল শুনে শিহাবের সৎ বাবা তেড়ে আসে, কোন শুয়োর ঢিল দিচ্ছিস, তোদেরকে আমি পুলিশে দিবো। শিহাবের মা আশঙ্কা করছে, নিশ্চয়ই শিহাবের কিছু হয়েছে, মন মনে হয় বেশি খারাপ এজন্য বাসায় আসতে না পেরে ঢিল দিচ্ছে, আহারে আমার বাচ্চাটারে আমি কীভাবে দেখবো।

বারাকাত সাহেব চিল্লাচিল্লি করতে করতে ভেতরে ঢুকে, শিহাবের মাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে, তোমার অসভ্য পোলাডা পাড়ার বখাটেদের নিয়ে এসব করে।
কি যে বলেন, শিহাবতো কাজে ব্যস্ত থাকে, ও এসব করবে কখন। বসেন, মাথাটা ঠান্ডা করেন, প্রেশার হাই হয়ে যাবে, আপনার জন্য পানি নিয়ে আসি।
কিছুক্ষণ ঢিল ছুঁড়ে ক্লান্ত হয় তারপর আবার হাঁটা শুরু করে, “শালার বুইড়া মায়েরে একটা ফোনও কিন্না দেয় না, বাসায় গেলেও জ্বালা, আমারে দেখলেই তেলে বেগুনে জ্বইলা উঠে।”
মায়ের সাথে দেখা করার দুঃসহ স্মৃতি চোখের সামনে ভিড় করে। দুই মাস আগে বাসায় গিয়েছিলো ময়ের সাথে দেখা করতে, বারাকাত সাহেব বাইরে ছিলো এ সুযোগে ঘরে বসে মা ছেলে কথা বলছিলো, হঠাৎ করে বাসায় এসে শিহাবকে দেখে রাগারাগি শুরু করে, শিহাবের সামনেই ওর মাকে চড় থাপ্পড় শুরু করে দেয়, শিহাবের মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিলো, “কেন যে মা বাইর করে দিছিলো, না হয় ঐদিনই একটা দফারফা কইরা ছাড়তাম” মনে মনে ভাবে।

আজ সারাদিন কী করবে বুঝতে পারছে না, ভেতরের অস্থিরতা দূর করার জন্য চলে যায় ক্লাবে, সেখানে আরেক শ্রেণীর বন্ধুদের পাওয়া যাবে, নেশারত এসব বন্ধুরা খুবি নিম্নশ্রেণীর, কেউ হয়তো মাঝ পথে লেখা পড়া ছেড়ে দিয়েছে, কেউবা কোনো লেখা পড়াই করেনি, কিন্তু ওরা একটা টিম, একসাথে মিলে ছিনতাই থেকে শুরু করে সমস্ত অন্যায় কাজগুলো করে থাকে।
ক্লাবে ঢুকতেই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা বন্ধুগুলো লাল চোখে ওর দিকে তাকায়, কলিম বলে ওঠে, কিরে শালা এতোদিন কোন মাগীর ঘরে আছিলি, তোর কোন দেহাই পাই নাই।

আরে দূর, এসব বালছালের সময় নাই, শিহাব ওদের সাথে বসে পড়ে।
সময়! ব্যঙ্গাত্মক স্বরে এটা বলে রহম হা হা হা করে হাসতে থাকে, “তা তোর সময়গুলা কই ওড়াল দেয় ”
শিহাবের আর কোনো হুঁশ নেই, ও কল্কি টানছে, মনের সুখে ধোঁয়া ছাড়ছে কিছুক্ষণ পরে জোরে ঘনশ্বাসে, “বুকটা হালকা হইতাছেরে ” তারপর আবেগীসুরে, “বুকটা এতো কষ্ট পুষে কেন” হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
রহম কিছুটা সমব্যথী, আমাগো আবার কষ্ট কিরে, সব কষ্টতো কল্কার ভিতরে।

“হ রে এ কল্কা না থাকলে আমাগো জীবন ছাই হইয়া যাইতো, এখন দুঃখ কষ্টগুলা ধোঁয়া হইয়া আমাদের দেহটাকে টিকাইয়া রাখছে, “অনার্স ফাইনাল ইয়ার পর্যন্ত পড়া হিমেল মাঝে মাঝে দার্শনিক হয়ে যায়।
শিহাব কিছুটা চেঁচানোর স্বরে, ” আমি নাকি জারজ, আমার জন্মের ঠিক নাই, তোরা শুন, আমার বাপ মা আছে, ওগো শরীয়ত মতো বিয়া হইছিলো আবার তালাকও হইয়া গেছে, আচ্ছা বলতো আর কেউর কি তালাক হয় না, তারা কি হগলতে জারাজ, ঐ চামেলিরে পাইতাম যদি ওরে জারজ বাচ্চার মা বানাইয়া ছাড়তাম।”

চামেলি! বিস্মিত হয়ে, “হায়রে পাগল! তুই এহনো চামেলি ফুলের গন্ধ শুকতাছস, আরে তোর যদি এতোই ভালা লাইগ্গা থাহে আমাগো কইলেইতো জামেলা চুইক্কা যায়, ঐ মাইয়ারে বাসা থাইক্কা তুইল্লা আনমো, রোমেল থাম তুই, শিহাবের আসল ঘটনা হুইন্না লই, কলিম জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকায়।
শিহাব আগের কথাই বলতে থাকে, তোরা জানস না , আমি বিশ বছর পর্যন্ত বাবার কাছে আছিলাম, সৎমায় খাওন দিতে গড়িমসি করতো, একদিন এমোন রাগ উঠলো প্লেটে জোরে এক লাত্তি মারলাম, সৎমায়ের কপালে গিয়া পড়লো। হেরপর যে বাড়ি ছাড়ছি আর যাই নাই। এহনো বাবায় যাইতে কয়, আমি নিজেই যাই না, পাঁচ বছর ধইরা বাড়ির বাইরে আছি। আমি নাকি জারজ, কারে কমুরে এ যন্ত্রণার কতা।
শিহাব এই বোতলডা নে, মনের সুখে খা, তোর কষ্ট আরো হালকা হইয়া যাইবো।
সুমনের কাছ থেকে বোতলটা নিয়ে নিয়ে ঢক ঢক করে গিলে পুরাটাই শেষ করে দেয়, আরে আস্তে আস্তে খা, বেশি খাইলে আবার মইরা যাবি। রোমেল সাবধান করতে চায়।

মরন আইলেতো ভালোই অইতো, আর ভালা লাগেনারে, এ জীবনডা শেষ কইরা দিতে মন চায়।
রোমেল ভাই এ পাড়ায় পুলিশ আইসে পলাও, বাইরে থেকে কেউ একজন সাবধান করে দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে, যে যার মতো ছুটে ছুটে পালায়, রোমেল শিহাবকে ধরে রাখে, আস্তে যা, পড়ে যাবি তোর জন্য আমাদের সবাইকে ধরা পড়তে হইবো, শালার দিনের বেলায়ও শান্তি নাই পুলিশ হানা দেয়, এইখান দিয়া আয়, সামনের বাড়িটায় যাই, অইটা আমার পরিচিত বাড়ি।
রোমেল দরজা ধাক্কায়, অই খালা তাড়াতাড়ি খোল।

মধ্যবয়সী এক মহিলা দরজা খোলে, তোর সাথে এইডা কে, মালপানি আছেতো, মালপানি ছাড়া এইহানে জায়গা নাই।
আগে ঢুকতে দিবা তো, মহিলাকে ধাক্কা দিয়ে রোমেল ভিতরে ঢুকে, শিহাবকে আস্তে করে খাটে শুইয়ে দেয়।
উনিশ বিশ বছরের এক তরুণী পানি নিয়ে আসে, কি হইছে রোমেল ভাই।
কিছু হয় নাই, তুই আমার হাত পা টিইপ্পা দে, তোরে কিছু দিমুনে।
শখ কতো, আমি আফনেরে টিপতে আই নাই, রোগী দেখতে আইছি।
রোগী কে! ওয়েতো ছেক খাওয়া মজনু। প্রেমিক চিনোস, অই অইলো খাস প্রেমিক।
আপনেওতো প্রেমিক অইতে পারেন অইসব শুয়াশুয়ি না কইরা।
আমি না শুইলে তোরা টেকা পাবি কই থাইক্কা।
ভালোবাসলেতো আর টাকা লাগে না।
ভালোবাসা! হাহাহা! ভালোবাসা কারে কয় জানোস, শিহাবও ওদের কথায় যোগ দিতে চায়, এইডা কে কেরে! কার লগে ভালোবাসার কতা কস।
দেখতো তোর পচ্ছন্দ হয় নাকি।
আমারে পচ্ছন্দ না করার কি আছে, আমি কি দেখতে খারাপ নাকি হুম তোমারে পচ্ছন্দ হইছে, তোমার নামডাইতো জানা হইলো না। শিহাব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সৌন্দর্য বের করার চেষ্টা করে।
আমার নাম শিলা, আমি আপনার বন্ধুর বউ।
বউ! রোমেল তুই বিয়া করলি কবে।
টাকা ফালা, সাথে সাথে তোর বউ হইয়া যাইবো। সারাদিনে কয়জনের বউ হয় তা মনে হয় ওর গণায়ও থাহে না। রোমেল হাসতে থাকে।

ও এই কতা, আমি তো ভাবলাম কি না কি, তা শিলামনি, আসো এইখানে, আমার কাছে বসো।
যা কাছে বস, দেখ, শিহাব তোরে কি সুন্দর কইরা শিলামনি কইয়া ডাকলো।
আরো এক চোট নেশা, আনন্দ উল্লাস, যেনো দুনিয়ার সব দুঃখ কষ্ট মুছে গেছে, সমস্ত ধরনের অশ্লীল ফুর্তির পর শিহাব বের হয়, রাত তখন বারোটা, একাকী পা দুলিয়ে হাঁটতে থাকে, বুকের কষ্টটা আবারো জাগছে , ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে ওঠে, নেশাগ্রস্থ শিহাব টলতে টলতে চামেলির বাড়ির সামনে গিয়ে চিল্লাতে থাকে, অই চামেলি বাইর হ, তোর লগে কতা আছে। আমার দাদার বাড়ি চিনোস, তোর চৌদ্দ গুষ্ঠি কিনতে পারবো। শিহাবের মুখের জড়ানো কথার আওয়াজে মধ্যরাতের দু’একটা কুকুর তাদের চিৎকার থামিয়ে নীরবতা পালন করছে সমব্যথী হয়ে।

x
error: Content is protected !!