হেমন্তের সোনালি প্রান্তর: এস আই সানী

‘সবুজপাতার খামের ভেতর

হলুদগাঁদা চিঠি লেখে,

কোন্ পাথারের ওপার থেকে

আনল ডেকে হেমন্তকে?’

কবি সুফিয়া কামালের চোখে আচমকা ধরা দেয় হেমন্ত। তিনি হঠাৎ হেমন্তকে পেয়ে তার রূপে বিভোর হয়ে রচনা করেন তার মধুর সৃষ্টি ‘হেমন্ত’ ছড়াটি। তিনি হেমন্তের আচমকা আগমনকে কোনো সাগরের ওপার হতে ডেকে আনার সাথে তুলনা করেছেন। সাগর পেরিয়ে আসুক কিংবা নদী সাঁতরিয়ে আসুক, হেমন্ত বাংলাদেশ এবং বাংলার প্রকৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ঋতুবৈচিত্র্যের এক বিস্ময়কর দেশ বাংলাদেশ। কেউবা এদেশকে বলেছেন ‘রূপময় বাংলাদেশ’, কেউবা বলেছেন ‘রূপসী বাংলা’, আবার কেউ বলেছেন ‘সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ’। আসলে এদেশ একেক ঋতুতে একেক রূপে ধরা দেয় একেকভাবে। প্রতিটি ঋতু তার স্বতন্ত্র রূপে অনন্য। আর এ ঋতুবৈচিত্র্যের বিচিত্র রূপে বিভোর হয়ে একেকজন কবি এদেশকে বিশেষায়িত করেছেন একেকটি বিশেষণে।

পালা করে এদেশে ছয়টি ঋতুর যাওয়া আসা। আর এ ঋতুগুলো তাদের স্বভাব অনুযায়ী প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে বিচিত্র রূপে। কোনোটা প্রকৃতিকে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়, আবার কোনোটা এসে গুড়িয়ে যাওয়া প্রকৃতিতে এনে দেয় সজীবতা। কোনো ঋতু হয় ধূসর কিংবা ফ্যাকাসে, আবার কোনো ঋতুর রূপ রঙিন ঝলমলে। প্রকৃতির এমন রঙিন পালাবদল সাধারণত এদেশ ছাড়া অন্যকোথাও দেখা যায় না। আর তাই তো কেবল এদেশকেই বলা হয় ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। আর আমি বলি, ঋতুবৈচিত্র্যের বিস্ময়কর দেশ। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা এমনই এক বৈচিত্র্যময় ঋতু- হেমন্ত এবং হেমন্তের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

হেমন্ত: শান্তশিষ্ট, স্নিগ্ধ এবং অত্যন্ত মধুর একটা ঋতু হেমন্ত। অত্যন্ত চমৎকার এবং অনিন্দ্য সুন্দর ঋতু হেমন্ত। রূপময় বাংলাদেশের ছ’টি ঋতুর মধ্যে হেমন্ত চতুর্থ। কার্তিক এবং অগ্রহায়ণের সমন্বয়ে হেমন্তের গঠন। ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আদ্রা’ এ দু’টি তারার নামানুসারে কার্তিক ও অগ্রহায়ণের নামকরণ করা হয়েছে। বর্ষায় ধুয়ে যাওয়া আকাশে পেঁজাতুলোর ন্যায় সাদামেঘের বয়ে যাওয়া এবং নদীতীরজুড়ে শুভ্রসাদা কাশফুলের ঝরে যাওয়ার দিন শেষে হেমন্ত খুব আয়েশে এসে বসে প্রকৃতিতে। দখল করে নেয় প্রকৃতির সমস্তটা। প্রকৃতিকে সাজিয়ে দেয় তার আপন রূপের মাধুরীতে। মুছে দেয় তার পূর্বকার সহোদর শরতের সবটুকু স্মৃতিচিহ্ন। এ যেন তার একার রাজত্ব, একক অধিপতি। হেমন্ত প্রকৃতির একক দখলদার হয়ে একএক করে প্রকৃতিতে কায়েম করতে থাকে তার রাজত্ব। যা চলতে থাকে তার সময়ের শেষ অবধি। তার দিন শেষ হতেই প্রকৃতিতে আগমন ঘটে হিমঝরানো শীতের। মূলত অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে শীতের আগমনী বার্তা। আর তাই হেমন্তকে আবার বলা হয়ে থাকে শীতের পূর্বাভাস ঋতু।

একসময় বাংলাসনের শুরু হতো এই হেমন্ত দিয়ে। সম্রাট আকবর বাংলাপঞ্জিকা তৈরির সময় হেমন্তের অগ্রহায়ণকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা করেন। এমাসে নতুন ফসল ঘরে উঠলে তিনি চাষিদের থেকে খাজনা আদায় করতেন। এটাকে তাই খাজনা আদায়ের মাসও বলা হতো।

 

সোনালি সৌন্দর্যে হেমন্ত আসে বাংলার প্রকৃতিতে। মাঠেমাঠে সোনালি পাকাধানের ছড়াছড়ি। দেখে মনে হয় স্বর্ণের আস্তরণ। মনে হয়, কে যেন মুঠোমুঠো সোনা ছড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের মাঠেঘাটে। হালকা শীতলহাওয়ায় দোল খায় সেসব সোনাধানের শীষ। সে দৃশ্য দেহমনে তৃপ্তি আনে। গ্রামবাংলার মাঠঘাট পাকাধানের মৌমৌ গন্ধে ভরে ওঠে। দিকেদিকে সাড়া পড়ে যায় ধান কাটার। ধুম পড়ে যায় ফসল তোলার। নবান্নের নিমন্ত্রণে হেমন্ত আসে বাংলার অলিতে-গলিতে অনুপম সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে। পালিত হয় নবান্ন উৎসব। নানান রকম পিঠাপুলি আর নতুন চালের পায়েস রান্না হয় গ্রামবাংলার প্রতিটা বাড়িতে। মূলত হেমন্তের পূর্ণতা এখানেই।

হেমন্তের রূপ: হেমন্ত তার নিজস্ব রূপে অনন্য। প্রকৃতিকে সাজাতে অন্য কারো থেকে রূপ ধার করতে হয় না তার। হেমন্ত মাঠেমাঠে বেড়ে ওঠা ফসলে যেমন সোনার বরণ ছড়িয়ে দিয়ে চারপাশটা মৌমৌ গন্ধে ভরপুর করে তোলে, তেমনি সবুজ প্রকৃতিকে করে তোলে আরো গাঢ়সবুজ এবং রূপময়। আর সবুজের ফাঁকেফাঁকে রংবাহারি ফুলের রঙিনছটায় প্রকৃতিকে দেয় পূর্ণতা।

হেমন্তের সুনীল আকাশ বেয়ে সকালের সূর্যটা কাঁচারোদ ছড়িয়ে দেয় পৃথিবীতে। আর সন্ধ্যেটা সাজায় রক্তিম আভায়। এসময় সারবেঁধে নীড়ে ফেরা পাখিগুলো যখন আকাশ বেয়ে বয়ে চলে, তখন অপরূপ সে দৃশ্য হৃদয়মনে তৃপ্তি আনে। হেমন্তের সন্ধ্যার এমন রূপ শিল্পীর রঙে আঁকা ছবি ভেবে ভুল করে কেউকেউ।

হেমন্তের ধরন: অন্যান্য ঋতুর চেয়ে হেমন্তের ধরনটা আলাদা। কার্তিকের দিনগুলোতে তাপমাত্রা একটু বেশি থাকলেও অগ্রহায়ণ তা আস্তেআস্তে প্রশমিত করে, নামিয়ে আনে নিচের দিকে। কার্তিক যদি জনমনে দ্রোহ এনে দেয়, তবে অগ্রহায়ণ তার সমাপ্তি নামায়; বরং মানুষের মাঝে এনে দেয় স্বস্তি। আর এ দুয়ের সংমিশ্রণ হলো হেমন্ত। এসময় অনুভূত হয় না-গরম, না-শীত। বাংলাদেশকে যদি নাতিশীতোষ্ণ দেশ বলা হয়, তবে হেমন্তকে বলা হয় নাতিশীতোষ্ণ ঋতু।

এসময় খুব সকালে টগবগিয়ে সূর্য ওঠে পূর্বাকাশের বুক চিরে। তারপর মিহিরোদে পুরোদিনটাকে মুখর করে গোধূলীর রক্তিম আভায় পশ্চিমাকাশ রাঙিয়ে টুপ করে ডুব দেয় সন্ধ্যায়। তারপর পুরোরাতটাকে করে তোলে ঝিঁঝিঁপোকার বাসর-আসর। মুখরিত করে স্বচ্ছ আকাশটা ঢেলে দেয় রূপোলী চাঁদের কিরণ। সঙ্গে থাকে লক্ষকোটি ঝিকিমিকি তারার নিরেট আলো। শেষরাতে শীতশীত আবেশে জড়িয়ে যায় শরীর। মা কিংবা নানী-দাদীর আপনহাতে নিখুঁতভাবে তৈরি পাতলা নকশিকাঁথায় উপশম হয় সে শীতের।

এসময় ভোর সকালে হালকা শিশির জমতে দেখা যায়। দূর্বাঘাসের ডগায়ডগায় জমে ওঠা সে শিশিরগুলো যেন মুখ উঁচু করে দেখে ভোরের সূর্যকে। আবার এই শিশিরে স্নান করে ভোরবেলা শিউলিতলা সুরভিত হয় শিউলিফুলের শুভ্রপাঁপড়ীতে। হেমন্তের অগ্রহায়ণে সন্ধ্যার প্রকৃতিতে হালকা কুয়াশার চাদর টানতেও দেখা যায় অহরহ।

হেমন্তে ফোটা ফুল: অন্যান্য ঋতুর মতো হেমন্তেও নানাজাতের ফুল ফোটে। আর সেসব ফুলেফুলে সানন্দে নাচানাচি করে দলছুট মৌমাছি আর প্রজাপতিরা। মুখ ভেজায় সৌরভিত মধু আর রসে।

এ ঋতুতে ফোটা ফুলের মধ্যে রয়েছে- সুগন্ধি গন্ধরাজ, শিউলি, মল্লিকা, কামিনী, হিমঝুরি, দেবকাঞ্চন, রাজ অশোক, বকফুল, ছাতিম প্রভৃতি। এসব ফুল বাহারি রঙে হেমন্তকে পরিপূর্ণ রাঙিয়ে তোলে। এছাড়া খাল-বিল, নদী-নালা, হাওড়-বাওড়ে লাল-সাদা শাপলা আর পদ্মফুলের নাচন দেখা যায় সগৌরবে।

 

হেমন্তের সোনার ফসল: মূলত মাঠেমাঠে সোনার বরণ মেখে সোনালিরূপ ধারণ করা পাকাধান হেমন্তের প্রধান ফসল, হেমন্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এসময় গ্রামবাংলার পথপ্রান্তর আর মাঠজুড়ে যতদূর চোখ যায় ততদূর কেবল পাকাধানের ছড়াছড়ি দৃষ্টিতে বিস্ময় আনে। পাকাধানের মাঠগুলো যেন একেকটি স্বর্ণের আস্তরণ। পাকাধানের মিষ্ট-মধুর মৌমৌ ঘ্রাণে অঘ্রাণ মাৎ হয়। বিভোর হয় গ্রামীণ পরিবেশ। পাকাধানের শীষেশীষে হিমেল বায়ুর ঢেউ; ফড়িং আর প্রজাপতির নাচানাচি; চড়ুই, বাবুই আর ধানশালিকের কিচিরমিচিরে মুখরিত হয় হেমন্তের মাঠ। এ যেন শিল্পীর রংতুলিতে আঁকা ছবি কোনো।

 

মাঠজুড়ে পাকাধানের দোলন দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফোটে। রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে বর্ষায় রোপিত আমন ধান শরতের বাতাসে দোল খেয়ে বেড়ে উঠে আজ এসে পড়েছে হেমন্তের সোনালি প্রান্তরে। চাষির শ্রম আজ সার্থক। আনন্দের সীমা থাকে না তার। দিকেদিকে তখন ধান কাটার ধুম পড়ে যায়।  মাথায় টুপড়ি পরে পরম আনন্দে গান গেয়ে চাষিরা খচাখচ ধান কাটে। একসময় ধানকাটা শেষ হলে সেগুলো আঁটিবেঁধে শুইয়ে রাখে অগ্রহায়ণের মাঠে। তারপর আসে কাঁধে বাগ ঝুলিয়ে বয়ে নেয়ার পালা। কেউ আবার গরুর গাড়িতে করে বহনের কাজটা সারেন। আবার কেউকেউ বড় আঁটিবেঁধে মাথায় করে বয়ে থাকে। আবার হাওড় অঞ্চলের মানুষদের বাহন হলো নৌকা। তবে এখনকার দিনে এগুলোর কোনোটিই খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন ধানকাটা, বওয়া বা মাড়াই- সবই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন সময় ও শ্রম বেঁচে যাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য। মাঠ থেকে ধান বওয়ার সময় গাঁয়ের কৃষাণবধূ আর পল্লীবালারা দলবেঁধে মাঠে আসে। ঝরেপড়া ধানের শীষ কুড়িয়ে রাখে খেজুরপাতা দিয়ে তৈরি ডোল আর টাঙারিতে। এসময় ঝাঁকেঝাঁকে ধানশালিক, চড়ুই আর বাবুই পাখি এসে মাৎ করে অগ্রহায়ণের মাঠ। চিঁহিচিঁহি শব্দ তুলে মনের আনন্দে খুটেখুটে খেতে থাকে ছড়িয়ে থাকা পাকাধান। তখন আবার পল্লীর দস্যিবালকদের সাথে বাধে তাদের খুনসুটি। দস্যিছেলেরা গুলতি আর এঁটেল মাটি দিয়ে তৈরি রোদে শুকানো ছোটোছোটো গুলি নিয়ে ধাওয়া করে পাখিদের পিছু। ধাওয়া খেয়ে পাখিদের দল ছড়িয়ে পড়ে এদিকওদিক। পরক্ষণে আবার ডানা ঝাপটে ছুটে আসে হেমন্তের মাঠে। পেটপুরে ধান খেয়ে হালকা কুয়াশায় মোড়া সাঁঝের আলোয় নীড়ে ফেরে নীলাকাশ সাঁতরিয়ে। এমন মধুর দৃশ্য কেবল হেমন্তেরই দান।

চাষিদের ধান বওয়া শেষ হলে বড় উঠোনে চলে মাড়াই করার কাজ। কেউ আবার আঙিনার পাশ দিয়ে বড়বড় গাদা করে রাখে ধানের আঁটি। আগের দিনে ধান মাড়াই করা হতো সনাতন পদ্ধতিতে। সারা উঠোনে ধানের আঁটি বিছিয়ে দিয়ে আঙিনার মাঝখানকে কেন্দ্র করে একপাল গরুকে বৃত্তাকারে হাঁটানো হতো প্রতিনিয়ত। গরুর পায়ের ক্ষুরের আঘাতে শীষ থেকে আলাদা হয়ে যেত প্রতিটা ধানবীজ। কেউ আবার কলের লাঙল দিয়ে ধান মাড়াইয়ের কাজ সারতো। আবার কেউকেউ পটে আছড়িয়ে সারতো এ কাজটি। তবে এখনকার দিনে ধান মাড়াই খুবই সহজসাধ্য। আধুনিক বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে এ কাজে।

ধান মাড়াই শেষে আসে ধানভানার প্রক্রিয়া। এখন যেমন আধুনিক মেশিনে ধান ভানা হয়, কিন্তু তখনকার দিনে মেশিন ছিল না। তখন গ্রামবাংলার ঘরেঘরে ঢেঁকির  প্রচলন ছিল। এ ঢেঁকিতেই ধান ভানা হতো। চাল কোটা হতো। সকাল, বিকাল কিংবা রাতেও চলতো ঢেঁকির ধাপুরধুপুর শব্দ। পরম আনন্দ নিয়ে কৃষাণবধূরা নতুন ধান থেকে বের করে আনতো নতুন অন্ন। চলতো চিরশাশ্বত উৎসব নবান্নের প্রস্তুতি।

হেমন্তের নবান্ন: আবহমানকাল ধরে হেমন্ত নিয়ে আসে উৎসব আর আনন্দমুখর দিন। ঘরে ঘরে রাঙে নতুন চালের উৎসব। এই উৎসব ‘নবান্ন উৎসব’। এই উৎসব হেমন্তের প্রধান উৎসব। এই নবান্নের জন্য আবহমানকাল ধরে গ্রামবাংলার মানুষেরা মুখিয়ে থাকে। ছেলে-বুড়ো, কিশোর-কিশোরী, যুবা-তরুণ, নবীন-প্রবীণ সবার মাঝে দেখা দেয় প্রাণচাঞ্চল্য। খুশিতে বাগবাগ হয় সকলে।

নবান্ন শব্দটি ‘নব’ এবং ‘অন্ন’ শব্দ দু’টির সমন্বয়ে গঠিত। যার অর্থ নতুন অন্ন। অর্থাৎ, নতুন ধান থেকে নতুন যে অন্ন বা ভাত পাওয়া যায় সেটাকেই বোঝায় নবান্ন। নতুন ফসল ঘরে তোলা উপলক্ষে কৃষকরা নবান্ন উৎসব পালন করে থাকে। সাধারণত অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি হয়ে থাকে এ উৎসব। কেননা এসময় আমন ধান কেটে ঘরে তোলা হয়। এই নতুন ধানের চাল রান্না উপলক্ষে গ্রাম জুড়ে উৎসব বসে। আগেকার দিনে কোনোকোনো অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে নিয়ে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হতো, এবং পরে ক্ষেতের বাকি ধান কাটার পর ভেনে নতুন চালের পায়েস করা হতো। বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব এখনো হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে ফসল তোলার পরদিনই নতুন ধানের ফিরনি-পায়েস অথবা ক্ষীর তৈরি করে আত্মীয়স্বজন ও পাড়াপড়শির ঘরেঘরে বিতরণ করা হয়। ক্ষীর-পায়েসের পাশাপাশি থাকে নানাপদের মুখরোচক পিঠাপুলিও। এসময় মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে ‘নাইওর’ আনা হয়। সঙ্গে নিমন্ত্রণ করা হয় জামাইকেও। জামাই নিয়ে নৌকায় চড়ে মেয়ে নাইওর আসে বাপের বাড়িতে।

নবান্ন উৎসবে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় নৃত্য, গানবাজনাসহ আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পালন করা হয়। এছাড়া সদ্য ধানকাটা অগ্রহায়ণের মাঠে বসে গ্রামীণ লোকজমেলা। লাঠিখেলা, বাউলগান, নাগরদোলা, বাঁশি, শখের চুড়ি, খৈ, মোয়াসহ প্রভৃতি বিনোদনোপকরণ ও পণ্যের পসরা বসে গ্রাম্য সে মেলায়।

 

হেমন্তের কাব্যকথা: হেমন্ত আর নবান্নের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে অনেক কবিসাহিত্যিক মনের মাধুরি মিশিয়ে নানাভাবে  তাদের কাব্যকথায় হেমন্তের রূপ তুলে ধরেছেন চমৎকারভাবে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায় নবান্নের চিত্রটি অত্যন্ত উপভোগ্য। হেমন্তের আগমনী, এর প্রকৃতি ও স্বভাবের এক চঞ্চল রূপ এঁকেছেন তিনি। তিনি লিখেছেন-

‘ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?

নবীন ধানের অঘ্রানে আজি অঘ্রান হ’ল মাৎ।

‘গিন্নি-পাগল’ চা’লের ফিরনী

তশতরি ভ’রে নবীনা গিন্নি

হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশীতে কাঁপিছে হাত।

শিরনী রাঁধেন বড় বিবি, বাড়ী গন্ধে তেলেসমাত!’

এছাড়া হেমন্ত ঋতুকে নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মিষ্টিসুরে গেয়েছেন-

‘হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে,

হেমন্তিকা করলো গোপন আঁচল ঘিরে।

ঘরেঘরে ডাক পাঠালো

দীপালিকায় জ্বালাও আলো,

জ্বালাও আলো, আপন আলো,

সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’

হেমন্ত ঋতু নিয়ে কবি সুফিয়া কামালের মধুর ছড়াটি প্রথমেই উল্লেখ করেছি। উক্ত ছড়াটির শেষাংশে তিনি লিখেছেন-

‘সকালবেলা শিশিরভেজা

ঘাসের ওপর চলতে গিয়ে,

হালকা মধুর শীতের ছোঁয়ায়

শরীর ওঠে শিরশিরিয়ে।’

পল্লীকবি খ্যাত জসীম উদদীন হেমন্তপ্রকৃতিতে গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন তার কবিতায়। তিনি তার অমর কীর্তি নকশীকাঁথার মাঠে লিখেছেন-

‘আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান,

সারামাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।

ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধে উড়িছে বায়

কলমিলতায় দোলন লেগেছে, হেসে কুল নাহি পায়।’

এছাড়া আরো অসংখ্য কবিসাহিত্যিক হেমন্তকে তাদের রচনায় এনেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। যা হেমন্তের অপূর্ব রূপের কথাই প্রমাণ করে। স্বল্প পরিসরে সবগুলো উল্লেখ করা গেল না।

 

হেমন্তের একাল: হেমন্তের একাল বড়ই নাজুক। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রূপময় বাংলাদেশকেও গ্রাস করেছে। যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পড়েছে এদেশের বৈচিত্র্যময় ঋতুগুলোর ওপরও। রূপশ্রী হেমন্তও বাদ যায়নি তা থেকে। আশ্বিনের অনেকটা দিনজুড়ে থেকে যায় শরতের চিহ্ন। আবার অগ্রহায়ণ শেষ হওয়ার আগেই বেড়ে যায় শীতের প্রকোপ। নিজঘরে হেমন্ত যেন হয়েছে পরবাসী।

 

এখন আর আগের মতো হেমন্তের প্রকৃতি যেন সাজে না আপন রঙে। রঙিন ফুলগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে দিনদিন। আকাশ কখনো মেঘলা থাকে, আবার কখনো সূর্যের তেজোদৃপ্ত রোদ যেন সবকিছু ঝলসিয়ে দেয়। অগ্রহায়ণের মাঠেও দেখা যায় না আগের মতো ধানশালিক, কাঠশালিক কিংবা চড়াইয়ের ঝাঁক। তালগাছে ঝোলে না বাবুইবাসা। এযেন হেমন্তের স্বভাববিরুদ্ধ।

 

এছাড়া আগের দিনের হেমন্তের ঐতিহ্যও অনেকাংশে হারিয়েছে একালে। ঢেঁকির প্রচলন নেই বললেই চলে। ধান কাটা-মাড়াই-ভানা থেকে শুরু করে এখন সবকিছু হচ্ছে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। আগের মতো অতটা নেই বাগ, কিংবা গরুর গাড়ি অথবা কলের লাঙল। নবান্ন উৎসবও হারিয়েছে প্রাণ। ফলে হেমন্তকে এখন আর অনুভব কিংবা উপলব্ধি করা যায় না তেমনভাবে। হেমন্ত ঋতু প্রকৃতিতে কখন আসে আর কখনই বা হয় তার প্রস্থান, তা বুঝতে পারে না শহরকেন্দ্রীক মানুষেরা। কেবল গ্রামের মাঠপ্রান্তরে পাকাধানের সোনারঙ দেখে বুঝতে হয়, হ্যাঁ, হেমন্ত এসেছে গাঁয়ে।

 

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব প্রকৃতির বুক থেকে কেবল হেমন্তকালকে কেড়ে নিচ্ছে না, ঋতুরানী শরৎ এবং ঋতুরাজ বসন্তকেও নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে ধীরেধীরে।

 

হেমন্তে নিবেদন: যদিও আগের দিনের হেমন্তকে এখন আর পাওয়া যায় না, তবুও হেমন্ত আসে আমাদের মাঝে। হেমন্তকে আসতেই হয়। কাত্তিকের নীলকুয়াশায় মুড়ে হেমন্ত আসে গ্রামবাংলার জনপদে, মাঠ-ঘাট-প্রান্তরে। হেমন্ত এলেই বাংলার মাঠে-প্রান্তরে হলুদ-সোনারঙের বিস্তীর্ণ আস্তরণ তার অমোঘ বিশালতায় সোনালি পালক ছড়িয়ে দেয়। হলদে ধানের ক্ষেতে হিমেল হাওয়ার দাপাদাপি শীষেশীষে খসখস আওয়াজ তোলে। এদেশের হাওড়বাওড়, জলাশয়ে অতিথি পাখির পদাচরণায় মুখর করতে আসতেই হয় অগ্রহায়ণের হিমেল দিনগুলির। ভোর পেরিয়ে শিশিরভেজা স্নিগ্ধ সকালে শিউলির সুরভি ছড়াতে হেমন্ত আসে বাংলার পথেঘাটে, কুটিরের আঙিনায়। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব হেমন্ত ঋতুকে যতই প্রভাবিত করুক, তাকে আসতেই হবে কৃষকের বিস্তীর্ণ পাকাধানের মাঠে। মাঠেমাঠে পাকাধান সোনার বরণ মেখে আর হিমেল হাওয়ায় দুলেদুলে হেমন্তকে নিয়ে আসবে বারেবার এই বাংলার পথপ্রান্তে। সর্বোপরি, হেমন্ত আসুক প্রতিবছর নিটোলপায়ে হেঁটেহেঁটে এদেশের বিস্তীর্ণ সোনালি প্রান্তরে। সোনাঝরা হেমন্তে রইলো এ আমার একগুচ্ছ নিবেদন।

আরো পড়ুন: আদা খাওয়ার উপকারিতা

আমাদের গুগল নিউজ চ্যানেল: বাংলা ক্রনিকল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *