বই রিভিউ: আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের ইতিকথা আফগানিস্তান হতে আমেরিকা

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের ইতিকথা আফগানিস্তান হতে আমেরিকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অ.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন

বইয়ের নাম: আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের ইতিকথা আফগানিস্তান হতে আমেরিকা

লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অ.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন

 

খ্যাতিমান  রাজনীতি বিশ্লেষক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক  ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের জন্মটা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি বরিশালে।তিনি পাকিস্তান আর্মি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন চৌকুস কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়াও দায়িত্ব পালন করেছেন  নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে   নিজের পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৩০ টির অধিক । নির্বাচন নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী এই লেখকের অনবদ্য সৃষ্টি হলো ‘ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের ইতিকথা আফগানিস্তান হতে আমেরিকা’।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই বইটি যেকোনো পাঠকের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু হবে এতে কোনো দ্বিধা নেই।পালক পাবলিশার্স থেকে  ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো বইটি প্রকাশিত হয়। পাঠক প্রিয়তার কারণে বইটির এখন পর্যন্ত  ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে মোট ১৪টি অধ্যায়ে বিভিন্ন ঘটনা বস্তুনিষ্ঠ  আলোচনা করা হয়েছে।পরিশেষে লেখকের পর্যালোচনা রাখা হয়েছে। বইটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা হল ২৯৬ এবং এর লিখিত মূল্য ধরা হয়েছে চারশত ষাট টাকা। বইটির ISBN Number হল ISBN 9789848143346

এখন আসি বইটির প্রেক্ষাপট নিয়ে। ৯/১১ এ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাকেই এই বইয়ের মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।আজকের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস বলতে আমরা যা বুঝি তা মূলত ৯/১১ এর পর থেকে সৃষ্ট। টুইনটাওয়ার হামলার পর  আমেরিকা আফগানিস্তানে ‘অপারেশন  এন্ডিউরিং ফ্রিডম ‘  নামে যে মিশন শুরু করেছিল তা তা বিশ্ব পরিমণ্ডলে কতটা সন্ত্রাস নির্মূল করতে পেরেছে তা তর্কসাপেক্ষ।

এই বইয়ে লেখক দেখাতে সক্ষম হয়েছেন যে, বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের নামে স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে।এর পিছনে লেখকের কিছু পর্যবেক্ষণ হল :  মধ্য এশিয়ার কথিত স্বাধীন দেশগুলোতে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের নামে সন্ত্রাসের লালন পালন এবং আরব বসন্তের আফটার ম্যাথ,সিরিয়ায় চলমান সংকট, ইরাকের বিধ্বস্ত অবস্থা,সোমালিয়ার অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়া,বুকো হারাম,আল কায়দা,আল শাবাবের উদয় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসকে আজও জিইয়ে রেখেছে। এবং এসবের উত্থানের পিছনে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে যে মার্কিন অফিস জড়িত তা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

এই বইটি পাঠককে টুইন টাওয়ার হামলা এবং হামলার জন্য বিমান ছিনতাই এবং ঘটনার পূর্বে ও পরের আদ্যপ্রান্ত সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিবে।সেই সাথে পাঠক জানতে পারবে হামলা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বুশ এবং হোয়াইট হাউজের টালমাটাল অবস্থা সম্পর্কে।

বইটি পড়লে আরও জানা যাবে যে হামলার পর প্রেসিডেন্ট বুশ আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে উদ্দ্যেশ্যে করে বলেন:  ওসামা বিন লাদেনকে তাদের হাতে তুলে দিতে এবং তিনি এও ঘোষণা করেন যে : ‘Either you with us or with them’ অর্থাৎ, দুনিয়ার সকল দেশকে সিদ্বান্ত নিতে হবে তারা আমাদের সাথে নাকি সন্ত্রাসীদের সাথে। এরপরপরই মূলত পৃথিবী বদলে যেতে থাকে। প্রেসিডেন্ট বুশ আরও ঘোষণা করেন : আমাদের এ যুদ্ব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। বইটি পড়লে পাঠক আরও জানতে পারবে যে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান কেন অপরিহার্য ছিল।তখন ইসলামাবাদের সাথে পেন্টাগনের যে সমস্ত বনিবনা হয়েছিল তার বস্তুনিষ্ঠ তথ্য এই বইয়ে চিত্রিত হয়েছে।

বইটি পাঠক কেন পড়বেন তার অন্যতম কারণ হলো আফগানিস্তানের মানুষের মনোভাব, জাতিগত উপলব্ধি এবং জুলুমের প্রতিবাদ সম্পর্কে। তালেবানদের পূর্বে সেখানে সোভিয়েত আগ্রাসন এবং আগ্রাসন বিরোধী আফগানি মনোভাব, সোভিয়েত বিরোধী  জেহাদের উপাখ্যান এই বইয়ে খুব সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বইটিতে আরও আছে সোভিয়েত আগ্রাসন পরবর্তী গৃহযুদ্ব এবং তারপর তালেবানদের সরকার গঠন নিয়ে বিস্তর আলোচনা।  সেই সাথে সোভিয়েত বিরোধী জেহাদে ওসামা বিন লাদেনের একাত্বতা।

বইটিতে লেখক দেখিয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান আক্রমণের মূল কারণ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস নির্মূল নাকি অন্য কিছু।

আমেরিকা কেন এই ভূখন্ডে আঘাত হানলেন। নাকি মধ্যপ্রাচ্যের তেল খনিজ সম্পদ এর পিছনে মূখ্য ভুমিকা রাখছে।

পাঠক তালেবান এবং আলকায়দা সম্পর্কে বিস্তর জানতে পারবে। তালেবানদের নারী নীতি, শিক্ষা নীতি ইত্যাদি সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়েছে। বইটিতে লেখক জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা সমালোচনাও করেছেন।জাতিসংঘ যে বর্তমানে কোনো বিরোধ ঠেকাতে একদম অকার্যকর এবং দেওলিয়া তা ফুটে উঠেছে লেখকের ভাষায়।

বইটির শেষদিকে লেখক আলোচনা করেছেন পাকিস্তানের এবোটাবাদে বিন লাদেন হত্যা এবং তালেবানদের আত্নসমর্পণ সংক্রান্ত বিষয়ে।

বইটিতে লেখক আরও প্রশ্ন রেখেছেন ‘পৃথিবী কি সত্যই বদলে যাবে?’

আসলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমেরিকার সামরিক অভিযানের পর মূলত প্রতিটি দেশেই স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। আফগানরা বিগত এক দশকের সোভিয়েত আগ্রাসন আর গৃহ যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছিল এরই মাঝে আবার এলো মার্কিন আগ্রাসন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে শীতল যুদ্বে লিপ্ত দেশগুলোই আমেরিকার নেতৃত্বে এক হয়ে পাকিস্তানের সমর্থনে জেহাদে অবতীর্ণ হন। এ জেহাদের ফলাফল হল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং পূর্ব ইওরোপ মুক্ত হয় সোশালিস্ট, কম্যউনিস্ট এবং গডলেজ সব নাগপাশ থেকে। জগৎজুড়ে জয়জয়কার হয় পুঁজিবাদের।  তাই আজ শুনতে হচ্ছে ‘ হয় আমাদের সাথে থাকো নয় তাদের সাথে থাকো।’  পৃথিবী ক্রমেই স্বৈরাচারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। জন্ম হয়েছে শতশত জেহাদি গ্রুপ যাকে পশ্চিমারা ইসলামিক টেরোরিজম নামে আখ্যায়িত করছে আর পৃথিবীটাকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকা স্বাধীনতার গাল-গল্পের নামে মূলত স্বাধীনতা খর্ব করেই যাচ্ছে।  ৯/১১ পরবর্তী আমেরিকার আফগান আক্রমণ মূলত হিতে বিপরীত হয়েছে।আজ তারা তাদের খরচ বহন করতে না পেরে শুন্য হাতে ফিরে যাচ্ছে সাথে নিয়ে যাচ্ছে কয়েক হাজার মার্কিন সেনার ডেথ সার্টিফিকেট আর দিয়ে যাচ্ছে ২০ বছরের ট্রাজেডি।