দলছুট: সমরেশ মজুমদার

দলছুট: সমরেশ মজুমদার

দলছুট

সমরেশ মজুমদার

মধধ্যরাত্রে বোলপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে হাফপ্যান্ট আর হাতকাটা নীল গেঞ্জি, দরজার বাবা খুব অসুস্থ।

উঠেছিল যুবকটি। মাঝারি উচ্চতার রোগা হাতল ধরে দাঁড়িয়েছিল। সে মরিয়া গলায় “ওহহ! নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবেন উনি। শরীরে বিপুল ময়লা জিক্স, আর প্রায় বিবর্ণ জিজ্ঞেস করল, “জেনারেল কম্পার্টমেন্ট আপনি কী করেন? গেঞ্জিশার্ট আলগা হয়ে আছে। মাথার কোথায় জানেন?”

। বি এ পাশ করার পর কিছুদিন টিউশনি উসকোখুসকো চুলগুলাকে মাঝে-মাঝেই । লোকটি হিন্দিতে বলল, “না ভাই। এটা করেছিল সে। তাই উত্তরটা সহজেই জিভে আঙুলের শাসনে সংযত রাখছে সে। ট্রেন মিলিটারি কামরা। কোথায় যাবেন?” এসে গেল, “মাস্টারি।”আসার ঘণ্টাখানেক আগে ওর শুভানুধ্যায়ী। ট্রেন দুলে উঠল। সে চেঁচাল, “নর্থ বেঙ্গল।। । ‘আচ্ছা!” লোকটি চোখ বড় করল, “এর একজন জেনারেল ক্লাসের টিকিট কেটে নিয়ে খুব জরুরি।”

চেয়ে বড় দেশের সেবা আর কী হতে পারে। গিয়েছিল। তখন সে ছিল বাস-রিকশা স্ট্যান্ডের । ‘আপাতত এখানে উঠে পড়ুন, পরের আপনাকে আমি মাস্টারজি বলে ডাকব। আমি পিছনের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। টিকিট আর কিছু স্টেশনে নেমে খুঁজে নেবেন।”

ছেলেবেলায় নেতাজি সুভাষ বসুর খুব ভক্ত টাকা তার হাতে দিয়ে শুভানুধ্যায়ী বলেছিল, লোককটার কথা শেষ হতেই প্রায় দৌড়ে ছিলাম। তাঁর ছবিতে ফুল দিতাম। বাবার বড় “চুপচাপ চলে যাও। দিন দশেক পরে পাবলিক কামরার হাতল ধরে উপরে উঠে এল সে। ব্যবসা ছিল। সেসবে না গিয়ে ভাবলাম বুথ থেকে ফোন করে জেনে নিয়ো এদিকের লোকটা বলল, “সাবাস। রোগা হলেও বডি দেশসেবা করব। পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে অবস্থার কথা। সাবধান, এমন কিছু কোরো না, ফিট আছে।”

। মিলিটারিতে ঢুকে গেলাম। দেশ-মায়ের ইজ্জত যা দেখে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হবে।

সে মুখ ঘুরিয়ে কামরার ভিতরটা দেখল। বাঁচানোর জন্য প্রতিজ্ঞা করলাম,” লোকটা শুভানুধ্যায়ী অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার দশ বেশিরভাগ বার্থই খালি, বাকিরা ঘুমোচ্ছে। হাসল, “আমার নাম চন্দ্রশেখর গুপ্তা।” মিনিট পরে সে স্টেশনে ঢুকেছিল। ঢোকার লোকটা দরজা বন্ধ করে বলল, “আসুন, ট্রেন ছুটছে অন্ধকার ঘিরে। যুবকের মনে মুখে কোনও চেকার না থাকায় সে আলো আমার সামনের বার্থ খালি আছে। নেক্সট হল, এই কামরায় সে বেশ নিরাপদে আছে। এড়িয়ে-এড়িয়ে এমন জায়গায় গিয়ে স্টেশন তো মালদহ, ওই অবধি বসে যান। পুলিশের লোকজন কখনওই সন্দেহ করবে না, দাঁড়িয়েছিল, যেখানে অন্ধকারের আড়াল যুবক সন্তর্পণে বসল। মিলিটারিদের নজর রাখবে না এই কামরার উপর।

যাওয়ার জন্য এই কামরায় সাধারণ যাত্রীদের। । চন্দ্রশেখর জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার তারপর ট্রেন এল হুড়মুড়িয়ে। সে ছুটল। ওঠা নিষেধ। মিলিটারিদের সঙ্গে পুলিশের রাতের খাওয়া হয়েছে?” সবই রিজার্ভড কামরা। জেনারেল কামরা, অনেক পার্থক্য আছে বলে সে শুনেছে। যে । যুবক হাসল, “কেন বলুন তো?” যেখানে উঠে বসলে কোনও রিজার্ভেশন চার্জ কয়েকবার তাদের সঙ্গে যাদের লড়াই হয়েছে, “দেখে মনে হচ্ছে হয়নি। দাঁড়ান, দিতে হয় না, চোখেই পড়ছিল না। ছােটাছুটি তারা অবশ্যই মিলিটারি ছিল না।

চন্দ্রশেখর তার ব্যাগ থেকে বড় কৌটো বের করতে-করতে ইঞ্জিনের বাঁশি জানান দিল। সে “ভাইসাব, আপনি তখন বললেন, খুব করে দুটো রুটি আর তরকারি একটা কাগজের তখন যে কামরার সামনে, তার ভিতরটা প্রায় জরুরি। কেউ কি অসুস্থ?

প্লেটে ঢেলে এগিয়ে ধরল, “মাস্টারজি, না খালি। একজন মােটাসােটা মানুষ, যার পরনে । “হ্যা, ঝটপট কথা বানাল সে, “আমার বলবেন না, খেয়ে নিন। জল দিচ্ছি।”

আছে।

দীর্ঘসময় অভুক্ত থাকায় খিদেবােধটাই চলে মাথার বালিশের নীচে যদি রাখা থাকে, তা উঠল। চন্দ্রশেখর কি মরে গিয়েছে? যতটুকু গিয়েছিল। তবু হাত বাড়িয়ে প্লেট নিল সে। হলে আলাদা কথা। নাকি লােকটা অস্ত্র পাবে শক্তিতে সম্ভব সে মানুষটার শরীর ধরে তারপর ধীরে-ধীরে খেয়ে নিল পুরােটাই। অসমে গিয়ে ওর ব্যাটালিয়ানে যােগ দেওয়ার ঝাঁকানাে সত্ত্বেও কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। জলের বােতল থেকে জল গলায় ঢেলে মনে পর।।

লােকটা মরে গেল? যে দেশের মাটিকে মা হল অনেকদিন পর সে তৃপ্তি পেল। চন্দ্রশেখর। । শ্বাস ফেলল সে। এখন পশ্চিমবাংলা বা বলে ভাবে, তার সম্মান রক্ষা করার জন্য তার শােয়ার চাদর আগেই বিছিয়ে রেখেছিলেন। ছত্রীসগঢ়ে পুলিশ বা কেন্দ্রীয় পুলিশরাই মিলিটারিতে এসেছিল সে, আচমকা মরে বললেন, ‘মালদহ আসতে যে সময় লাগবে, পাহাড়ে, জঙ্গলে টহল দিচ্ছে। ভারত সরকার গেল ? কপাল বেয়ে চটচটে তরল পদার্থ তার মধ্যে খানিকটা ঘুমিয়ে নিতে পারবেন। এখানে এখনও মিলিটারি নামায়নি। যদি নামায় চোখের উপর গড়িয়ে আসতেই সে হাত দিয়ে

। লােভ হচ্ছিল। কিন্তু লােকটাকে কতটা আর সেই ফোর্সে চন্দ্রশেখর থাকে, তা হলে সেটা মুছল। তখনই ওই মিলিটারিদের জন্য বিশ্বাস করা যায়, তা বুঝতে পারছিল না সে। কেমন হবে? এই লােকটা কি তাকে গুলি নির্দিষ্ট কামরা থেকে চাপা কান্না ভেসে এল। কামরায় তুলে, খাইয়েদাইয়ে ঘুমােতে বলছে। করবে? রুটি-তরকারি খাইয়েছিল বলে কি এখন সে কী করবে? প্রথমেই মনে হল, ঘুমিয়ে পড়লে পুলিশের হাতে যে তুলে দেবে আফসােস করবে? আচ্ছা, এই মুহুর্তে না হােক, বাঁচতে হবে। সে অনুমান করল এই কামরার

, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। ট্রেনিংয়ের মালদা স্টেশনে ট্রেন থামতেই যদি পুলিশ একটা দিক উঁচু হয়ে আছে। উঁচু দিকটা যদি সময় তাদের শেখানাে হয়েছিল, অপরিচিত কামরায় উঠে তাকে অ্যারেস্ট করে, তা হলে আবার নীচে নেমে আসে, তা হলে যে ঝাঁকুনি মানুষকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করবে না। আর তাকে ট্রেনে আশ্রয় দেওয়া, খাবার খাওয়ানাের হবে, তা সে নিতে পারবে না। চন্দ্রশেখরের পরিচিত হলে, তা সে বাবা, ভাই, দাদা যেই অপরাধে চন্দ্রশেখরের কি শাস্তি হবে? হওয়াটা মতােই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তার হােহাক না কেন, খানিকটা দূরত্ব রেখে মিশবে। অস্বাভাবিক নয়।

মনে পড়ল, এই কামরায় আরও কিছু লােক মনে রাখতে হবে বিপ্লবের শত্রুরা তােমার ঘুম পাচ্ছিল খুব। অভুক্ত শরীরে খাবার ঘুমিয়েছিল, কিন্তু মাত্র একজনের গলাই শুনতে চারপাশে বন্ধুর মুখােশ পরে বসে আছে। পৌছনাের পর আলস্য ছড়িয়ে পড়েছে। সে পাওয়া যাচ্ছে। সে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ভাঙা

সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কতদুরে শুয়ে পড়ল। বালিশ, চাদরের দরকার হল না, দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। চোখ আবার যাচ্ছেন?

পা-মাথা এক সরলরেখায় পৌঁছতেই চোখ বন্ধ ঢেকে যাচ্ছে চটচটে তরল পদার্থে। কিন্তু তা “অসম। এর আগের বার বর্ডারে ছিলাম। হয়ে গেল।

সত্ত্বেও সে চাঁদটাকে দেখতে পেল। ভাঙা। এবার যেতে হবে না।

অংশটা দিয়ে শরীর বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে। ঘুম ভাঙল কি ভাঙল না, বােঝার আগে কিন্তু ওপাশে কী আছে তা জানা নেই। সে ‘মাস্টারজি, এই জন্মভূমি, ভারত আমাদের তার মনে হল সে শূন্যে ভাসছে। তারপরই ধীরে ধীরে প্রথমে দুটো পা এবং শরীর বাইরে মা। বাইরের শত্রু মাকে আক্রমণ করলে আমরা শরীর আছাড় খেল প্রবলবেগে। আর্ত চিৎকার গলিয়ে দিয়ে দু’হাতে ভাঙা দেওয়াল ধরে তাদের হঠিয়ে দেব। মাটি-জল-আকাশকে রক্ষা শুধু তার কণ্ঠ থেকেই ছিটকে এল না, কয়েক সেকেন্ড ঝুলে রইল। তারপর হাত। করার জন্যে তিনটে বাহিনী জেগে আছে। অনেকগুলাে চিৎকার এবং কাতরানি রাতের ছেড়ে দিতেই ঘাসের উপর আছড়ে পড়ল। বাইরের শত্রু হল চিন আর পাকিস্তান। কিন্তু পৃথিবীটাকে ভয়ংকর করে তুলল। মাথায় সমস্ত শরীরে যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে। আঃ, শ্বাস দেশের ভিতরে শত্রু যারা, তাদের সঙ্গে লড়াই যন্ত্রণা, হাতে, কনুইয়ের কাছে অসাড় হয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল মিনিটখানেক ধরে। করা খুব শক্ত ব্যাপার।

যাওয়া সত্ত্বেও সে বুঝতে পারল কামরাটা মাটিতে হাত রেখে বুঝল, কামরার কাছাকাছি “কেন?” সে শ্বাস চেপে জিজ্ঞেস করল। রেললাইনের উপর নেই। চিৎকার, কান্না আরও উপর থেকে পড়লে ভয়ংকর ব্যাপার হত।

“তারা তাে আমাদের ভাই। ভারত বিরাট বাড়ছিল। সে কোনওমতে উঠে দাঁড়ানাের চেষ্টা সেখানে রেললাইনের পাথরের টুকরােগুলাে দেশ। কিছু লােককে ভুল বুঝিয়ে খেপিয়ে করতেই পড়ে গেল। এবং তখনই বুঝতে ছড়িয়ে আছে।। দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে বিপ্লব করাে। অল্পবয়সি পারল, সে আছড়ে পড়েছিল কোনও নরম জমিটা ঢালু। বুঝতে পেরে সে গড়িয়ে গেল ছেলেগুলাে নিজের কথা না ভেবে দেশকে জিনিসের উপর। অন্ধকারে কিছুই বােঝা নীচের দিকে। আর তখনই প্রবল শব্দ করে টুকরাে করতে চাইছে। মাস্টারজি, আমার বাঁ যাচ্ছে না।

কামরাটা উপর থেকে নীচে পড়ে কাত হয়ে হাত যদি বিপ্লব করতে চায়, তা হলে বাঁ পায়ের ট্রেনটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। কামরার একটা গেল। চাঁদের আলােয় দৃশ্যটা দেখে সে জ্ঞান কাছে খবর পৌছাবে? বুঝিয়েও যখন কাজ হয় দিক উপরে উঠে যাওয়ায় মেঝেতে দাঁড়ানাে হারাল।

, ওরা যখন একের পর এক মানুষ মেরে যাচ্ছে না। ওপাশের দেওয়াল চুরমার হয়ে। ফেলছে, তখন দেশ বাঁচাতে ওদের বিরুদ্ধেও গিয়েছে। দু’হাতে নিজেকে ধরে রেখে সে ওই যখন চেতনা ফিরল তখন ট্রেনলাইনের অস্ত্র চালাতে হচ্ছে, চন্দ্রশেখর শুয়ে পড়ল, দিকে তাকাতেই একফালি চাঁদ দেখতে পেল। পাশে প্রচুর মানুষ। বেশিরভাগই যে গ্রামের, ‘মাস্টারজি, আমরা দশ-বিশ হাজার শীতল চাঁদ। তখনই ট্রেনের লাইনের পাশের তা খালি গা, লুঙ্গি বা প্যান্ট দেখে বােঝা। আতঙ্কবাদীকে শাস্তি দিতে পারি, কিন্তু জমিতে মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর শােনা গেল। যাচ্ছিল। কামরা থেকে আহত বা মৃতদের আপনারা ইচ্ছে করলে দেশ থেকে তারা কী করবে বুঝতে পারছিল না। আহতদের নামিয়ে আনছে তারা। পুলিশের গাড়ির আতঙ্কবাদীদের দূর করে দিতে পারেন।” আর্তনাদ ক্রমশ বেড়েই চলছিল।

আওয়াজ কানে পৌছতেই পাশের বড় “কীরকম? প্রশ্নটা মুখ থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে সে হাতড়াল। তখনই সে অনুভব ঝােপটার আড়ালে চলে গেল সে। তারপরই এল।

করতে পারল, যে বার্থে সে শুয়েছিল সেখান মনে হল এখানে সে একজন আহত যাত্রী, “ভারতের সব শিশুকে যদি মাস্টারজিরা থেকে ছিটকে সামনের বার্থে আছড়ে পড়েও অপরাধ যখন করেনি, তখন পুলিশকে ভয় শেখায়, এই দেশ তাদের মা, আতঙ্কবাদ সেই হাত-পা না ভাঙার কারণ, চন্দ্রশেখরের শরীর। পাওয়ার কোনও কারণ নেই। তা হলে ভয়। মাকে টুকরাে করে ফেলবে, তা হলে তারা বড় ওর শরীর তার প্রাণ বাঁচিয়ে দিয়েছে। পাচ্ছে কেন? অবশ্য তাকে যদি আহত অবস্থায় হয়ে আজকের মতাে কারও কথায় পাগল হবে কোনওরকমে নীচে বসে সে চন্দ্রশেখরের ওই কামরা থেকে উদ্ধার করা হত, তা হলে , চোখ বন্ধ করল চন্দ্রশেখর।

শরীরে হাত রাখল, “চন্দ্রজি, চন্দ্রজি…। নিশ্চয়ই মিলিটারি বলে ভাবত না। তখন প্রশ্ন । চন্দ্রশেখরকে লক্ষ করল সে। নীচে একটা কোনও সাড়া না পাওয়ায় সে হাতড়ে উঠত, সে কীভাবে ওখানে উঠেছিল? কী, সুটকেস আর মাথার পাশে বড় চামড়ার থলি হাতড়ে মানুষটার মুখ স্পর্শ করল। একটা দিকে উদ্দেশ্য ছিল? যদি নাম-ঠিকানা জানতে পারত, ছাড়া আর কোনও লাগেজ নেই। একজন পাশ ফিরে রয়েছে ওর মুখ। সেটাকে সােজা তা হলে আর দেখতে হত না। হয়তাে ভেবে। সৈনিক কি সঙ্গে অস্ত্র রাখে না? ওর হাতে বা করতেই আবার ওপাশে ঢলে পড়ল। শরীরের নিত এই ট্রেনে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে তার সঙ্গীরা, কোমরে সেরকম কিছু দেখতে পাওয়া যায়নি। যাবতীয় তীব্র যন্ত্রণা ছাপিয়ে তার বুক কেঁপে সে বের হতে পারেনি ঠিক সময়। অথবা মিলিটারিদের খুন করার পরিকল্পনা নিয়ে ওই কামরায় উঠেছিল, দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ায় সুযােগ। পায়নি। ভাগ্যিস সে কামরা থেকে ঠিক সময় বেরিয়ে এসেছিল, না হলে দ্বিতীয়বারের ঝাঁকুনিতে মারা যেতে হত অথবা পুলিশের হাতে পড়তে হত।

ভিড় বাড়ছে, আর্তনাদও। কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না সে। এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে, শুধু মাথার পাশে নয়, শরীরের অন্য কয়েক জায়গা থেকেও রক্ত ঝরছে। বাঁ হাতের কনুই এতক্ষণ অসাড় হয়েছিল, এখন সেখানে তীব্র যন্ত্রণা। হচ্ছে। বােধহয় হাড় ভেঙে গিয়েছে। কোনওরকমে ওখানে গেলে, নিশ্চয়ই চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে। দুর্ঘটনার পরে তাে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। উঠতে গিয়ে হাঁটু কনকনিয়ে উঠল। ট্রেন থেকে নীচে পড়ার সময় হাঁটুতে যে চোট পেয়েছিল, তা এতক্ষণে মালুম হল। সে শুয়ে পড়ল। আবার।। । এই সময়, অন্ধকার যখন একটু পাতলা, চাঁদ যখন জোরদার, তখন ঝােপের ওপাশে। কিছু নড়ে উঠল। সে মাথা ঘােরাল। এবং তখনই চাপাস্বরে কেউ বলল, “আর এখানে। থাকা উচিত হবে না। এখনও অন্ধকার আছে, চল মাঠের ভিতর দিয়ে দৌড়ই।

দ্বিতীয় গলা বলল, “কিন্তু অর্ডার ছিল অ্যাক্সিডেন্টের পর গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে। চল, পেট্রল বােমাগুলাে ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দিই।”

“ধরা পড়ে যাব। ঠিক ধরা পড়ে যাব। ছুড়তে গেলে কাছে যেতে হবে।”

“তােকে অনেকক্ষণ থেকে ছুড়তে বলছি।”

“ওইরকম কান্না, চিৎকার শুনলে খারাপ লাগে না?” “তুই থাক। আমি যাচ্ছি।”

লেংচে-লেংচে কয়েক পা এগােতেই। । ‘শুনুন, আপনি বােলপুর থেকে ট্রেনে “যাস না। আর মানুষ মারতে ভাল লাগছে ।

চিৎকার কানে এল, “এদিকে একজন আছে, উঠেছিলেন। নিউ-জলপাইগুড়ি পর্যন্ত টিকিট তাড়াতাড়ি আসুন।”

। কেটেছেন। কিন্তু রিজার্ভেশন না থাকায় নাম‘ধেৎ।”

সে মাটিতে বসে পড়ে পায়ের আওয়াজ ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছে না, পুলিশ বলল, এবার একটা ছায়ামৰ্তেিক দেখতে পেল পেল। অনেক মানুষ ছুটে আসছে তার দিকে। “মনে করার চেষ্টা করুন।” সে। একটা থলে হাতে গুড়ি মেরে এগােচ্ছে। সে জ্ঞান হারাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে কানে এল, ঠিক তখনই চন্দ্রশেখরের কথা মনে পড়ে ওই লােকটা ট্রেনে আগুন ধরাতে যাচ্ছে। “আরে, আর-একজন পড়ে আছে ওদিকে। গেল। সে অস্ফুটস্বরে বলল, “চ-চন্দ্রআহত মানুষগুলাে, যারা এখনও কামরায় হাত নড়ছে, এখনও বেচে আছে।”

। চন্দ্রশেখর।। থেকে গিয়েছে, তারা পুড়ে মরবে। এই ট্রেনে।

পুলিশ নামটা লিখে নিল খাতায়, দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে সরকারকে বিপদে ফেলার

যখন জ্ঞান এল, তখন দিন বা রাত সে “টাইটেল ? জন্য। কিন্তু এই ট্রেনের আহত যাত্রীদের মেরে জানে না। বড় ঘরে আলাে জ্বলছিল। সে শুয়ে সে আবার চোখ বন্ধ করতেই পিছন থেকে কি বিপ্লব হবে? চন্দ্রশেখরের কথাগুলাে চট আছে মেঝেতে পাতা বিছানায়। মাথার পাশে একটি মহিলাকণ্ঠ ভেসে এল, “মাথায় চোট করে মনে আসতেই সে উঠে বসে একটা পাথর স্ট্যান্ড স্যালাইনের বােতল থেকে শরীরে জল পেয়ে মনে করতে পারছে না। কাল হয়তাে কড়িয়ে নিল। এই দিকে লােকজন নেই, সবাই যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছিল তার মাথা, হাত, মনে পড়ে যাবে।” ওপাশে ভিড় করছে। অনেকেই ট্রেনে উঠে।

পা, বুক ব্যান্ডেজে মােড়া। ঝাপসা ঝাপসা মনে পুলিশ উঠে গেল পাশের বিছানার পাশে আহতদের নামাচ্ছে। ছায়ামূর্তিটা যখন ট্রেনের হল, এখন সে হাসপাতালে।।

রাখা টুলে, “আপনার নাম? কাছাকাছি, তখন প্রাণপণ শক্তিতে, যে শক্তি

“খগেন। খগেন রায়। উঃ। কী যন্ত্রণা। তখনও শরীরে অবশিষ্ট ছিল, পাথরটা ছুড়ে

আপনার নাম?

‘আপনার শরীরের কোথাও চোট নেই, দিল সে। সােজা ছায়ামূর্তির মাথার পিছনে

প্রশ্ন কানে যেতে চোখ খুলল সে। লােকটা শুধু মাথার পিছনে লাগল কী করে?” সেটা আঘাত করতেই নিঃশব্দে পড়ে গেল পুলিশ। হাতে খাতা।

। ‘“জানি না। লেগে গেল। খােলা দরজায় একপাশে। তৎক্ষণাৎ পায়ের শব্দ হল। মখ “দয়া করে নাম বলুন। দাঁড়িয়েছিলাম! ঘুরিয়ে সে দেখল অন্য কণ্ঠস্বর যার ছিল, সেই – সে চোখ বন্ধ করল। তারপর ইচ্ছে করেই । ‘টিকিট কোথায়?” ছায়ামুর্তি মাঠের ভিতর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বিড়বিড় করল, “নাম?”

“ব্যাগে রেখেছিলাম।” অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

“নাম মনে পড়ছে না?”

পুলিশ বলল, “প্রচুর লুটপাট হয়েছিল সে মাথা নেড়ে না বলল।

অ্যাক্সিডেন্টের পরে। ওই অবস্থা দেখেও কী করে মানুষ লােভী হয়! ঠিকানা বলুন। খােলেনি সে। পাশের লােকটা অনর্গল মিথ্যে তারপর দরজার দিকে পা টিপে টিপে ‘মাটিগাড়া, শিলিগুড়ি।”

বলে যাচ্ছে। সে লক্ষ করছিল পুলিশ কথাগুলাে এগিয়ে গেল। তারপর সব চুপচাপ। সে বুঝতে পারল। বিশ্বাস করছে। সে শুনতে পেল তাকে। । এতক্ষণ মরার মতাে পড়েছিল সে। এবার পুলিশ এবং নার্স ঘর থেকে চলে গিয়েছে। সে কলকাতার বড় হাসপাতালে ভর্তি করা হবে হাত বাড়িয়ে চট করে অস্ত্রটা তুলে নিতেই মাথা ঘােরাল। লােকটা তাকে দেখল, “নাম ভাল চিকিৎসার জন্যে। আঘাত থেকে বুঝতে পারল, ওটা খুব ধারালাে ছুরি। চট করে। ভুলে গিয়েছেন?”

স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে বলে ভাবছে ওরা। চাদরের তলায় ঢুকিয়ে নিল ছুরিটাকে। । সে জবাব দিল না।।

আগামীকাল পাশের লােকটাকে ছেড়ে দেওয়া দরজার কাছে গিয়ে বােধহয় ছায়ামূর্তির । ‘আহতদের নিশ্চয়ই এক লাখ দেবে। তাই হবে। আনন্দে নাচছে লােকটা।

খেয়াল হল। আবার নিঃশব্দে ফিরে এসে উবু সত্যি নামটাই বললাম। বউ বাচ্চার উপকার । মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল অস্বস্তিতে। হয়ে দেখতে লাগল বিছানার চারপাশ। হবে। উঃ, পিছন থেকে এমন চোট মারল চাপাগলায় উত্তেজিত কথা শুনে সে মুখ আধখােলা চোখে সে দেখল, ছায়ামূর্তি ক্রমশ মাথায়, অবশ্য মেরে ভালই করেছে। অবশ্য ফেরাতেই পাশের বিছানায় দুজন মানুষকে অস্থির হয়ে উঠছে ছুরি না পেয়ে। খুঁজতে টাকাটা যদি পাওয়া যায়।”

দেখতে পেল। এখন এই ঘরে উজ্জ্বল আলাে খুঁজতে এদিকে চলে এসে মেঝে হাতড়াতে এবার কপালে ভাঁজ পড়ল তার। এই নিভিয়ে অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে দেওয়া লাগল। তারপর পিছন ফিরে লােকটার দিকে লােকটা সেই ছায়ামূর্তি, যে আগুন ধরাতে হয়েছে। ফলে আধশােওয়া লােকটার পাশে তাকাল। একটুও সময় নষ্ট করল না সে। যতটা। যাচ্ছিল। বলল, ““টাকার খুব দরকার? উঁচু হয়ে বসা ছায়ামূর্তিকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া সম্ভব জোরে ছুরিটার ফলা বসিয়ে দিল “কার নেই? একবার প্রচুর চোলাই যাচ্ছিল না।

লােকটার ঘাড়ের নীচে। কঁক করে উঠল। খেয়েছিলাম মরে যাওয়ার জন্য। মরলেই তাে । “তুই কী ভেবেছিস? একাই দাঁও মারবি? ছায়ামূর্তি। তারপর খসে পড়ল একপাশে। সরকার টাকা দেবে। শালা মরলাম না!” এ আমি হতে দেব না।

। বালিশের চাদরে ছুরিটাকে মুছল সে। হঠাৎ তার খেয়াল হল। পেট্রলবােমা তাে । “একদম কথা বলবি না। এরা ভেবেছে হাতলটাকে ঘষে-ঘষে নিশ্চিন্ত হয়ে পাশের ঝােলায় করে এই লােকটা নিয়ে যাচ্ছিল। আমি ট্রেনে ছিলাম, তাই আহত হয়েছি। কিন্তু বিছানায় ফেলে দিল। তারপর কপাল এবং সেগুলাে পাওয়া যায়নি? পেলে ওর পাশেই আমি জানি তুই আমাকে মারতে চেয়েছিলি। হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দরজার কাছে চলে এল। পাওয়া যেত। তা হলে নিশ্চয়ই এখানে ওকে

। হাসপাতালে এখন বিবর্ণ আলাে। পুলিশ রাখত না।

। ‘া তুই। পিছন থেকে কিছু ছুড়ে আমার দুটো বেঞ্চিতে গভীর ঘুমে। সে চুপচাপ বেরিয়ে “আপনি কী করেন? লােকটা জিজ্ঞেস মাথা ফাটাতে চেয়েছিলি!’

এল। আকাশটার গায়ে যেন অঢেল মায়া করল।

“বিশ্বাস কর, মা কালীর দিব্যি, আমি কিছু মাখামাখি হয়ে রয়েছে। ভাের হতে এখনও “ভুলে গিয়েছি। ছুড়িনি।”

দেরি। এত তারা অনেকদিন দ্যাখেনি সে। “আহা রে, জিভে শব্দ করল লােকটা “ফোট, এখান থেকে ফোট। তুই ঢুকলি কী কতদিন এই সময়ের আকাশের দিকে তাকায়নি। “কিসসু মনে পড়ছে না?” করে?”

। খানিকটা হাঁটতেই রেললাইন দেখতে। “একটু-আধটু।”

‘‘তক্কেতক্কে ছিলাম। সবাই ঘুমাচ্ছে দেখে পেল। কোন দিকে যাবে সে? ডান দিকেই “যেমন ?”

ঢুকে পড়েছি। শােন, আমি তােকে সাফ বলে যাওয়া উচিত। অল্প-অল্প বাতাস গায়ে লাগছে। “খুন করতাম। অনেক খুন।

। দিচ্ছি, গভর্নমেন্ট যা দেবে তার অর্ধেক যদি অদ্ভুত তৃপ্তি লাগছে এখন। চন্দ্রশেখরজি, শােনামাত্র লােকটা মুখ ফিরিয়ে নিল। আমাকে না দিস, তা হলে তােকে ফাঁসিয়ে আপনি নিশ্চয়ই খুশি হয়েছেন? তার বিশ্বাস দেব।”

আবার সে স্বপ্নে চন্দ্রশেখরকে দেখবে। মুশকিল সেই রাতে চন্দ্রশেখর স্বপ্নে এল। হেসে। । “কীভাবে ফাঁসাবি?’

হল, ইচ্ছে করলেই স্বপ্ন দেখা যায় না। জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছেন মাস্টারজি?” । ‘লাইন উড়িয়ে দিয়েছিল যারা, তাদের পুলিশের খাতায় তার নাম আতঙ্কবাদী

‘‘ভাল না। কিন্তু শুনুন, আমি মাস্টারজি মধ্যে তুই ছিলি। তুই মাওবাদী জানলে দশ বছর। হিসেবে লেখা আছে কয়েক মাস হল। বিপ্লবের নই।” জেলে ঢুকিয়ে রাখবে।

কথা শুনেছিল সে। দু’জন বেইমানকে খতম সে কী?

‘‘আমাকে ফাঁসালে তুই বাঁচতে পারবি?” করাও তাে এক ধরনের বিপ্লব। মশগুল হয়ে “আমি আপনাকে মিথ্যে কথা বলেছি।” লােকটা হিসহিস করে উঠল, “আমি আর । রেললাইনের মাঝখান দিয়ে হাঁটছিল সে। হঠাৎ “কিন্তু আপনি ট্রেনটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। মাওবাদী নই। ফোট।

। কান ফাটানাে শব্দে চমকে গিয়ে পিছন ফিরে কত মানুষ আগুনে পুড়ে মারা যেত। আমরা । সঙ্গে-সঙ্গে ছায়ামূর্তি ঝাঁপিয়ে পড়ল তাকাতেই দেখতে পেল একচোখা দৈত্যের আতঙ্কবাদীদের মেরে ফেলি দেশ বাঁচাতে, লােকটার উপরে। কিছু একটা দিয়ে বারবার মতাে তার দিকে ছুটে আসছে একটা আস্ত আপনি মানুষ বাঁচিয়েছেন। মানুষ নিয়েই তাে আঘাত করতে লাগল লােকটার মাথা এবং ট্রেন। দেশ,” কথাগুলাে বলেই চন্দ্রশেখর একটা। বুকে। তারপর যখন লােকটার গলা থেকে শব্দ । আতঙ্কে স্থবির হয়ে গেল একজন চমৎকার আলাের বৃত্তে মিশে গেল। তাকে বের হল না, তখন অস্ত্রটা ছুড়ে ফেলে দিল আতঙ্কবাদী। আর দেখতে পেল না সে।।

মেঝের উপর। শব্দ হল, গড়িয়ে এল বিছানার

পাশে। ছায়ামূর্তি উঠে দাঁড়াল। চাপাগলায় দু’দিন ধরে প্রচুর জেরার সামনেও মুখ বলল, “শালা! বেইমান।

Leave a Reply